
ছবি: সংগৃহীত
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাষ্ট্রীয় সংকটের দিকে তাকালে একটি নির্মম বাস্তবতা চোখে পড়ে—এখানে দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি। বিপুল জনসংখ্যা, সীমিত সম্পদ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান, বেকারত্ব, বৈষম্য এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন মিলে এমন এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, যেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা প্রায়ই বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়। শাসকেরা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন, পরিকল্পনা গ্রহণ করেন, অবকাঠামো নির্মাণ করেন; কিন্তু রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবনে সেই উন্নয়নের সুফল কতটা পৌঁছায়, সেটিই থেকে যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র একটি বহুল আলোচিত অর্থনৈতিক ধারণা। অর্থনীতিবিদ রাগনার নার্কসে দেখিয়েছেন, দরিদ্র দেশগুলোতে নিম্ন আয়, নিম্ন সঞ্চয়, নিম্ন বিনিয়োগ ও নিম্ন উৎপাদনশীলতা পরস্পরকে শক্তিশালী করে দারিদ্র্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। একজন দরিদ্র মানুষের আয় কম বলে তার সঞ্চয় কম; সঞ্চয় কম বলে বিনিয়োগের সামর্থ্য কম; বিনিয়োগ কম বলে উৎপাদনশীলতা বাড়ে না; উৎপাদনশীলতা না বাড়ায় আয়ও বাড়ে না। এভাবে দারিদ্র্য নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের মধ্যেই উপাদান তৈরি করে। ব্যক্তির ক্ষেত্রে যে চক্রটি সত্য, জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও তা অনেকাংশে প্রযোজ্য।
কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের সংকটকে কেবল অর্থনীতির এই সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতার একটি বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। এখানে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার, অসম ভূমিব্যবস্থা, সম্পদের অসম বণ্টন, দুর্বল শিল্পভিত্তি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। অনেক রাষ্ট্র স্বাধীনতা অর্জন করলেও তাদের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো ঔপনিবেশিক শাসনের চরিত্র থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। রাষ্ট্রের প্রশাসন নাগরিকের সেবক হওয়ার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রয়োগের যন্ত্র হিসেবেই রয়ে গেছে। ফলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে ওঠার বদলে তৈরি হয়েছে দূরত্ব।

এই বাস্তবতায় বিপুল জনসংখ্যা তৃতীয় বিশ্বের শাসকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জনসংখ্যা কোনো দেশের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিশাপ নয়। বরং দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীনের অভিজ্ঞতা দেখায়, জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু জনসংখ্যার তুলনায় কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, খাদ্যনিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার সক্ষমতা যখন অপর্যাপ্ত থাকে, তখন সেই জনসংখ্যাই রাষ্ট্রের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে।
সমস্যাটি জনসংখ্যার সংখ্যায় যতটা, তার চেয়ে বেশি রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায়। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু নাগরিকের সংখ্যা গণনা করা নয়; বরং প্রত্যেক নাগরিকের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের ন্যূনতম সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থান তৈরি হয় না, তখন বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেও কাজ পায় না। শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ে, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার সম্প্রসারিত হয়, মজুরি কমে যায় এবং জীবিকার অনিশ্চয়তা সামাজিক অসন্তোষকে উসকে দেয়। রাষ্ট্র তখন উন্নয়নের প্রতিষ্ঠান না হয়ে ক্রমশ সংকট ব্যবস্থাপনার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
এখানেই তৃতীয় বিশ্বের শাসকের সংকটের প্রশ্নটি সামনে আসে। শাসকগোষ্ঠী অনেক সময় রাষ্ট্র পরিচালনাকে জনকল্যাণের দায়িত্ব হিসেবে না দেখে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে বিবেচনা করে। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি কিংবা আয়বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রকল্প, রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ক্ষমতার বলয় সম্প্রসারণ অগ্রাধিকার পায়। রাষ্ট্রের সম্পদ তখন নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার উপকরণ না হয়ে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয় পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি। যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয়, দক্ষতার পরিবর্তে আনুগত্য এবং জনস্বার্থের পরিবর্তে গোষ্ঠীস্বার্থ যখন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান নিয়ামক হয়ে ওঠে, তখন প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি নিয়োগ, উন্নয়ন বরাদ্দ, ব্যবসায়িক সুযোগ, এমনকি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি হয়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক না থেকে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়। এর ফলে সুশাসনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

সুশাসনের প্রধান শর্ত হলো আইনের শাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, অংশগ্রহণ, ন্যায়বিচার এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টন। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে এই শর্তগুলো বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় দুর্নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির ওপর আঘাত। যখন একজন নাগরিককে সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয়, যখন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও একজন চাকরিপ্রার্থী বঞ্চিত হন, যখন রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে আইনের প্রয়োগ অসহায় হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ভেঙে যায়। আর রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা সুশাসনের সবচেয়ে বড় শত্রু।
দারিদ্র্য ও দুর্নীতির সম্পর্কও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতি উন্নয়নের অর্থনৈতিক সুফলকে সীমিত একটি গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে। সরকারি প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে, কাজের মান কমে, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম হয় এবং দরিদ্র মানুষের প্রাপ্য সুবিধা মাঝপথে হারিয়ে যায়। ফলে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য যে সম্পদ ব্যয় করা হয়, তার একটি অংশ দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায় না। অন্যদিকে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মানুষকে অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার কাছে অসহায় করে তোলে। এভাবে দারিদ্র্য দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, দুর্নীতি আবার দারিদ্র্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে।
তৃতীয় বিশ্বের আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাষ্ট্রীয় সম্পদের অসম বণ্টন। জাতীয় আয় বাড়লেও তার সুফল যদি সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে না পৌঁছায়, তাহলে প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনমানের প্রকৃত উন্নয়ন ঘটাতে পারে না। একদিকে বিপুল সম্পদের মালিক একটি ক্ষুদ্র শ্রেণি, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য, চিকিৎসার ব্যয়, বাসস্থানের সংকট ও শিক্ষার খরচ সামলাতে হিমশিম খাওয়া বিপুল জনগোষ্ঠী—এই বৈপরীত্য একটি সমাজে অর্থনৈতিক অসন্তোষের পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতাও তৈরি করে। উন্নয়নের পরিসংখ্যান তখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
বিশ্বায়নের যুগে তৃতীয় বিশ্বের এই সংকট আরও বহুমাত্রিক হয়েছে। আন্তর্জাতিক ঋণ, বৈদেশিক বাণিজ্যের অসম শর্ত, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা দরিদ্র রাষ্ট্রগুলোর নীতিনির্ধারণের পরিসরকে সীমিত করে। ঋণের সুদ পরিশোধ, আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট সামাল দিতে গিয়ে অনেক দেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গবেষণা ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারে না। তবে বৈশ্বিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত করে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, অপচয় ও নীতিগত ব্যর্থতার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্রের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা শাসকেরই দায়িত্ব।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়গুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশটি সীমিত ভূখণ্ডের মধ্যে খাদ্য উৎপাদন, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার ও দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয়, কৃষির উৎপাদনশীলতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এই অগ্রগতির পাশাপাশি রয়েছে কর্মসংস্থানের গুণগত সংকট, শিক্ষার সঙ্গে শ্রমবাজারের অসামঞ্জস্য, আয়বৈষম্য, নগরায়ণের চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির ঘাটতি। শহরে মানুষের ভিড় বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে নাগরিক সেবা বাড়ছে না। শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে জনসংখ্যাগত সম্ভাবনা অনেক ক্ষেত্রে জনসংখ্যাগত চাপে রূপ নিচ্ছে।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের উন্নয়ন দর্শন কী? উন্নয়ন কি কেবল সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, উড়ালসড়ক কিংবা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের নাম, নাকি উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন? একজন নাগরিকের আয় বাড়ছে কি না, তার সন্তান মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে কি না, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাচ্ছে কি না, চাকরি কিংবা ব্যবসার ক্ষেত্রে ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছে কি না, তার অধিকার রক্ষায় আইন সমানভাবে কাজ করছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরেই উন্নয়নের প্রকৃত মূল্যায়ন নিহিত। অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজনীয়, কিন্তু মানবিক উন্নয়ন ছাড়া তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন হতে পারে না।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন জনসংখ্যাকে বোঝা হিসেবে নয়, উৎপাদনশীল সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা। সে জন্য প্রয়োজন মানসম্মত ও কর্মমুখী শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়। একই সঙ্গে কৃষি ও শিল্পে উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, নারীর কর্মসংস্থান এবং তরুণদের উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে হবে। কেবল সরকারি চাকরির ওপর নির্ভরশীল কর্মসংস্থান নীতি দিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত না হলে সুশাসনের কথা কেবল বক্তৃতার বিষয় হয়েই থাকবে। ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে সংসদ, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রতিটি পর্যায় জনগণের কাছে ব্যাখ্যাযোগ্য হয়।

তৃতীয়ত, উন্নয়নের সুফল ন্যায্যভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। কার্যকর করব্যবস্থা, সম্পদের ওপর ন্যায়সংগত কর আরোপ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির স্বচ্ছতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় সরকারি বিনিয়োগ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে গ্রাম ও শহরের উন্নয়নবৈষম্য কমাতে হবে। রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ননীতি অব্যাহত থাকলে একদিকে মহানগরগুলো জনসংখ্যার চাপে বিপর্যস্ত হবে, অন্যদিকে প্রান্তিক অঞ্চলগুলো সুযোগ ও সম্ভাবনা থেকে বঞ্চিত থাকবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, আর শাসকেরা জনগণের অর্পিত দায়িত্ব পালনকারী মাত্র। এই বোধ প্রতিষ্ঠিত না হলে উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রশাসনিক সংস্কার কিংবা দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কোনোটিই স্থায়ী ফল দেবে না। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কেবল নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর শক্তি নিহিত রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, বিরোধী পক্ষের অধিকার, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক পরিবর্তনের নিশ্চয়তায়।
পরিশেষে বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার সংকট প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সুশাসনের সংকটের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিপুল জনসংখ্যা কোনো রাষ্ট্রের অনিবার্য দুর্ভাগ্য নয়, যেমন দারিদ্র্যও কোনো জাতির চিরস্থায়ী নিয়তি নয়। সঠিক পরিকল্পনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান থাকলে জনসংখ্যাই হয়ে উঠতে পারে উন্নয়নের প্রধান শক্তি। কিন্তু শাসকেরা যদি জনগণকে নাগরিকের পরিবর্তে কেবল ভোটার, করদাতা কিংবা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র আরও শক্তিশালী হবে।
একটি রাষ্ট্র কত বড় সেতু নির্মাণ করল, কত কিলোমিটার সড়ক তৈরি করল কিংবা জাতীয় আয় কত শতাংশ বাড়ল—এসব দিয়ে তার সাফল্যের পূর্ণাঙ্গ বিচার হয় না। প্রকৃত বিচার হয়, সেই রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দরিদ্র নাগরিকটির জীবনে কতটা নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে পেরেছে। কারণ রাষ্ট্রের উন্নয়ন মানে কিছু মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি নয়; রাষ্ট্রের উন্নয়ন মানে অধিকাংশ মানুষের জীবনকে অর্থবহ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা। যে রাষ্ট্র তার জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারে না, সে রাষ্ট্র জনসংখ্যার ভারে নুয়ে পড়ে; আর যে শাসক জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে শেখে না, তার হাতে সুশাসন কখনোই প্রতিষ্ঠিত হয় না।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আইয়ের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

