কোরআনের কিছু আয়াত আল্লাহ কেন রহিত করেছেন

কোরআনের কিছু আয়াত আল্লাহ কেন রহিত করেছেন

রহিত করা মানে আল্লাহর জ্ঞানের পরিবর্তন নয়

নাসখ নিয়ে ভুল ধারণার একটি বড় কারণ হলো একে মানুষের আইন পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করা। মানুষ সাধারণত নতুন পরিস্থিতি বুঝে, আগের সিদ্ধান্তে ভুল ধরা পড়লে কিংবা পুরোনো আইন অকার্যকর হলে আইন বদলায়।

আল্লাহর বিধানে এমন ধারণা প্রযোজ্য নয়। মানুষের জ্ঞান সীমিত, ভবিষ্যৎ সে জানে না। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে পরিব্যপ্ত করে। কোন বিধান কখন কার্যকর হবে, কত দিন থাকবে, কখন তার স্থলে অন্য বিধান আসবে, সবই তাঁর অনাদি জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত।

সুরা বাকারার ১০৬ নম্বর আয়াতে নাসখের উল্লেখের পর আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি জানো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান?’ এবং পরের আয়াতে বলেন, ‘তুমি কি জানো না, নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই?’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০৭)

এতে বোঝা যায়, বিধান নির্ধারণ ও পরিবর্তনের অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনি সৃষ্টিজগতের মালিক, তাঁর নির্দেশের ওপর কারও কর্তৃত্ব নেই।

একটি উপমা ভাবা যেতে পারে। চিকিৎসক রোগীকে বর্তমান অবস্থার জন্য একটি ওষুধ দেন এবং আগে থেকেই জানেন, কয়েক দিন পর অবস্থা বদলালে অন্য ওষুধ লাগবে। পরে ওষুধ বদলানো তাঁর আগের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ করে না, বরং তা চিকিৎসার নির্ধারিত প্রক্রিয়ারই অংশ।

অবশ্য আল্লাহর জ্ঞান মানুষের জ্ঞানের সঙ্গে তুলনীয় নয়। উপমাটি শুধু এটুকু বোঝানোর জন্য যে মেয়াদ আগে থেকে নির্ধারিত থাকলে পরবর্তী পরিবর্তন আগের সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করে না। একইভাবে প্রথম বিধান ও পরবর্তী বিধান উভয়ই আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার অংশ।

পূর্বযুগের বিধান পরের যুগে রহিত করা

আল্লাহ-তাআলা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নবী-রাসুলের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েত দিয়েছেন। পূর্ববর্তী উম্মতের কিছু বিধান পরবর্তী বিধান ভিন্ন হতে পারে। আবার একই যুগের ভেতরেও পরবর্তী ওহির মাধ্যমে কোনো বিধান পরিবর্তিত হতে পারে।

এ দুটি এক বিষয় নয়। উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশের কর্তৃত্ব প্রকাশ পেলেও আলোচনার ক্ষেত্র ও দলিল আলাদা।

আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন আমি এক আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত পরিবর্তন করে দিই, তখন আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন, সে সম্পর্কে তিনিই সর্বাধিক জ্ঞাত।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১০১)

অর্থাৎ কেন একটি বিধানের স্থলে অন্য বিধান আসে, তার পূর্ণ জ্ঞান তাঁরই। মানুষের পক্ষে প্রতিটি বিধানের অন্তর্নিহিত হিকমত সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা সম্ভব না-ও হতে পারে।

রহিত হওয়ার দাবিতে সতর্কতা

তবে এর অর্থ এই নয় যে বিধান পরিবর্তন ইচ্ছামতো বা মানুষের সুবিধা অনুযায়ী নির্ধারণ করা যাবে। রহিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারিত হবে কোরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ইসলামি দলিলের আলোকে। কেউ নিজের যুক্তি, পছন্দ বা সমসাময়িক পরিস্থিতির অজুহাতে কোরআনের কোনো বিধানকে রহিত ঘোষণা করতে পারেন না।

কোনো আয়াতের বিধান রহিত দাবি করার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই জরুরি:

  • সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদিসের দলিল কী

  • দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা আছে কি না

  • দুই আয়াতের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি আছে কি না।

নাসখের আলোচনা মূলত আদেশ, নিষেধ ও বিধানসংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। অতীতের কোনো ঘটনা সম্পর্কে কোরআনের বিবরণকে সাধারণ শরয়ি বিধানের মতো রহিত হওয়ার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/২৯৪, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)

অতএব দুটি আয়াতের মধ্যে আপাত অর্থগত পার্থক্য দেখলেই একটিকে অন্যটির দ্বারা রহিত ঘোষণা করা সঠিক পদ্ধতি নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাফসির, অবতরণের প্রেক্ষাপট ও ভাষাগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে উভয় আয়াতের সমন্বয় সম্ভব। রহিত কি না তা নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট প্রমাণ অপরিহার্য।

শেষ কথা

কোরআনের বিধান রহিত হওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করলে আল্লাহর প্রজ্ঞা ও বান্দার প্রতি অনুগ্রহের নানা দিক উন্মোচিত হয়। মুমিনের দায়িত্ব হলো কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ যথাযথভাবে বোঝা এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দেওয়া।

বিধানের সব হেকমত বুঝতে না পারলেও মুমিন বিশ্বাস করেন, আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতেই নির্ধারিত।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

Scroll to Top