
ছবি: এআই।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং শিল্পায়নে এ খাতের অবদান অপরিসীম। কিন্তু এই শিল্পের সাফল্যের পেছনে যাদের সবচেয়ে বেশি শ্রম ও ঘাম রয়েছে, সেই পোশাকশ্রমিকদের জীবনমান নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বড় হচ্ছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ, সন্তানের শিক্ষাব্যয় এবং চিকিৎসার খরচ মেটাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ফলে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনা এখন শুধু শ্রমিকের দাবি নয়, এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।
প্রশ্ন হচ্ছে, শ্রমিকের মজুরি বাড়ালে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে কি না? নাকি পরিকল্পিত ও উৎপাদনশীলতাভিত্তিক মজুরি পুনর্নির্ধারণের মাধ্যমে শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি রপ্তানি সক্ষমতাও ধরে রাখা সম্ভব? বিষয়টি আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সমাধান করতে হবে।
নতুন মজুরি বোর্ড: সময়ের দাবি-
সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবি জোরালো হয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে সর্বশেষ মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় তিন বছর ধরে এই মজুরি কাঠামো বহাল রয়েছে। অথচ এ সময়ে খাদ্যপণ্য, বাড়িভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষা ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই শ্রমজীবী মানুষের ওপর জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কতটা, তার একটি ধারণা দেয়।
এদিকে ১ নভেম্বর ২০২৬ সরকার পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। শ্রমিক, মালিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত এই বোর্ডের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা এবং শিল্পের সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখা।
এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে মজুরির তুলনা:-
বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) ২০২৫ সালের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার কয়েকটি দেশের উৎপাদন খাতের ন্যূনতম মাসিক মজুরি মার্কিন ডলারে তুলনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়ায় ১ হাজার ৫১২ ডলার, ভারতে ১৪৩–৪৯৬ ডলার, চীনে ২৫০–৩৫৩ ডলার, পাকিস্তানে ১২৩–২১১ ডলার, কম্বোডিয়ায় ২০৮ ডলার, ভিয়েতনামে ১৩৬–১৯৫ ডলার এবং শ্রীলঙ্কায় ১৮৩ ডলার। একই তুলনায় বাংলাদেশের ইপিজেডের মজুরি প্রায় ১০০–১০১ ডলার দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রচলিত পোশাকশ্রমিকদের সর্বনিম্ন ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরির সঙ্গে এই তুলনা করলে একটি বড় ব্যবধানের চিত্র পাওয়া যায়। তবে মনে রাখতে হবে, বিভিন্ন দেশের মজুরি অঞ্চল, শিল্পের ধরন, দক্ষতা ও মজুরি কাঠামোর ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। তাই এসব পরিসংখ্যানকে সরাসরি সমমানের জাতীয় পোশাকশ্রমিকের মজুরি হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না। তবু বাংলাদেশের শ্রমিকদের মজুরি যে আন্তর্জাতিক তুলনায় নিচের দিকে রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
শ্রমিকের জীবনমান বনাম শিল্পের প্রতিযোগিতা:-
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিপুল শ্রমশক্তি, উৎপাদন সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিনের গ্রহণযোগ্যতা। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮১ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরেও এ খাতের রপ্তানি আয় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ছিল। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতিতে এই শিল্পের গুরুত্ব কতটা, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
কিন্তু শ্রমিকের মজুরি বাড়ানোর প্রশ্নে মালিকপক্ষের উদ্বেগও অমূলক নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা রয়েছে। ক্রেতারা পণ্যের গুণগত মান, উৎপাদন খরচ, সময়মতো সরবরাহ এবং মূল্য—সবকিছু বিবেচনা করে ক্রয়াদেশ দেন। উৎপাদন ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে গেলে কিছু ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো বেশি চাপে পড়তে পারে।
তবে কম মজুরিই যে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার একমাত্র হাতিয়ার, এমন ধারণাও সঠিক নয়। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা, দক্ষ শ্রমিক, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি সাশ্রয় এবং অপচয় কমানোর মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হলে তাদের কর্মস্পৃহা, দক্ষতা ও উৎপাদনের মানও উন্নত হতে পারে। শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নকে তাই শুধু ব্যয় বৃদ্ধি হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মজুরি নির্ধারণে সরকারের করণীয়:-
নতুন মজুরি বোর্ডের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা যেন শুধু মালিকপক্ষের সক্ষমতা কিংবা শ্রমিকপক্ষের দাবি বিবেচনা না করে একটি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে মজুরি নির্ধারণ করে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
প্রথমত, একজন শ্রমিকের পরিবার পরিচালনার ন্যূনতম ব্যয় নিরূপণ করতে হবে। খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, গ্যাস-বিদ্যুৎ, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের একটি বাস্তবসম্মত ব্যয়তালিকা তৈরি করা জরুরি। ঢাকার শিল্পাঞ্চল এবং অন্যান্য অঞ্চলের জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্যও বিবেচনায় নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের পাশাপাশি বার্ষিক মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় মজুরি সমন্বয়ের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তিন বছর বা পাঁচ বছর পরপর নতুন করে আন্দোলন ও অস্থিরতা তৈরির পরিবর্তে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকলে শ্রমিক-মালিক উভয় পক্ষই উপকৃত হবে।
তৃতীয়ত, শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সরকারকে সহায়তা করতে হবে। সহজ শর্তে প্রযুক্তি উন্নয়ন ঋণ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা, বন্দর ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজীকরণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার জন্য বিশেষ সহায়তা কর্মসূচিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
চতুর্থত, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। তারা যদি কম দামে পণ্য কেনার চাপ দিয়ে উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত কমাতে চান, তাহলে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। ন্যায্য ক্রয়মূল্য, দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়াদেশ এবং সময়মতো বিল পরিশোধের নিশ্চয়তা দিতে তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
পঞ্চমত, পোশাকশ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যের আবাসন, রেশন সুবিধা, স্বাস্থ্যবিমা, মানসম্মত চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষায় বিশেষ সহায়তা চালু করা যেতে পারে। এসব সুবিধা শ্রমিকের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে। এতে শুধু নগদ মজুরি বাড়ানোর ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।
শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ:-
পোশাকশিল্পের মালিক ও শ্রমিক পরস্পরের প্রতিপক্ষ নন; বরং তারা একই শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশীদার। শ্রমিকের ঘাম ছাড়া কারখানার উৎপাদন সম্ভব নয়, আবার শিল্পের বিকাশ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানও নিশ্চিত করা যাবে না। তাই এক পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে অন্য পক্ষকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া কোনো দায়িত্বশীল নীতি হতে পারে না।
সরকারের উচিত এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা, যাতে শ্রমিকের ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত হয়, মালিকের ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা বজায় থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে এই অঙ্ক বাস্তবায়নের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এবং শিল্পভেদে প্রভাবও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, শ্রমিককে ন্যায্য মজুরি দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি তার শ্রমের অধিকার। আবার শিল্পের সক্ষমতা রক্ষা করাও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থ। সুতরাং সরকার, মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই সংকটের টেকসই সমাধান দিতে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্প শুধু সস্তা শ্রমের পরিচয়ে বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারে না। একে এগিয়ে নিতে হবে দক্ষ শ্রমিক, আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা এবং ন্যায্য শ্রমনীতির ভিত্তিতে। শ্রমিকের মুখে হাসি এবং শিল্পের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি—দুটিই নিশ্চিত করতে পারলে সেটিই হবে বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক বিজয়।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

