
ছবি: সংগৃহীত
জীবনে কখনো কখনো এমন পরিস্থিতি আসে, যখন সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে মনে হয়। চেষ্টা করেও যখন কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না, তখন মনের ভেতর তৈরি হয় অসহায়ত্ব। ইসলামে এমন মুহূর্তে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা এবং তার সাহায্য কামনা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এমনই অর্থবহ একটি জিকির হলো ‘লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’।
জিকিরটির অর্থ কী?
আরবি: لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
উচ্চারণ: লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
এই জিকিরের মাধ্যমে একজন মুমিন স্বীকার করেন, আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো কিছু করার প্রকৃত সামর্থ্য মানুষের নেই। এটি আল্লাহর ওপর নির্ভরতা, নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি এবং তাঁর সাহায্য কামনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
জান্নাতের গুপ্তধন
এই জিকিরের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে সহিহ হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে বলেন, তিনি কি তাকে জান্নাতের গুপ্তধনগুলোর একটি সম্পর্কে জানাবেন? এরপর তিনি বলেন, ‘লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’।
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৮৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৭০৪।
হাদিসটি থেকে বোঝা যায়, এই সংক্ষিপ্ত জিকিরের রয়েছে বিশেষ ফজিলত। অল্প কয়েকটি শব্দের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর প্রতি নিজের নির্ভরতা ও তাঁর অসীম ক্ষমতার কথা স্মরণ করতে পারেন।
কোরআনেও রয়েছে এই শিক্ষার ভিত্তি
সুরা আল-কাহফের ৩৯ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আল্লাহ যা চান, তাই হয়। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি নেই।”
এটি বাগানের মালিকের ঘটনা প্রসঙ্গে এসেছে। আয়াতটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়, সম্পদ, সাফল্য কিংবা অন্য কোনো নিয়ামত নিয়ে অহংকার না করে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন: ‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ এই পূর্ণ বাক্যটি হাদিসে বর্ণিত জিকির; সুরা আল-কাহফের ৩৯ নম্বর আয়াতে এর সঙ্গে সম্পর্কিত ‘লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ কথাটি এসেছে।
কখন এই জিকির পড়বেন?
এই জিকির নির্দিষ্ট কোনো কঠিন পরিস্থিতির জন্যই সীমাবদ্ধ নয়। একজন মুসলিম বিভিন্ন সময়ে এটি পাঠ করতে পারেন। যেমন
• কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর সাহায্য চাইতে।
• নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে।
• ভালো কাজ করার সামর্থ্য ও শক্তির জন্য আল্লাহর মুখাপেক্ষী হওয়ার কথা স্মরণ করতে।
• দৈনন্দিন জিকির ও আল্লাহর স্মরণে অংশ হিসেবে।
বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও এ জিকিরের বিশেষ শিক্ষা রয়েছে। সুনান আবু দাউদের ৫০৯৫ নম্বর হাদিসে বাড়ি থেকে বের হওয়ার দোয়ার অংশ হিসেবে এটি এসেছে।
মানসিক প্রশান্তির সঙ্গে এর সম্পর্ক
মানুষ যখন জীবনের নানা সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, তখন নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে আল্লাহর সাহায্য কামনা করা তার বিশ্বাস ও মানসিক স্থিরতার অংশ হতে পারে। এই জিকির মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, সবকিছু একা সামলাতে হবে এমন নয়, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা মুমিনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
তবে জিকির পড়লেই সব সমস্যা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সমাধান হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক নয়। ইসলামে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখার পাশাপাশি চেষ্টা করা, দায়িত্ব পালন করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়ারও শিক্ষা রয়েছে।
‘লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ শুধু মুখে উচ্চারণ করার একটি বাক্য নয়; এর মধ্যে রয়েছে আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি বিশ্বাস, নিজের সীমাবদ্ধতার স্বীকৃতি এবং তার সাহায্যের ওপর নির্ভরতার শিক্ষা।
জীবনে সাফল্য কিংবা কঠিন সময় উভয় ক্ষেত্রেই এই জিকির মানুষকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই এর অর্থ বুঝে, আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠ করা এবং সেই শিক্ষাকে জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

