স্বাস্থ্য খাতে সরকারি কেনাকাটায় অনিয়ম যেন পিছু ছাড়ছে না। এবার বরিশালের মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তিনটি টেন্ডার ঘিরে কোটি টাকা জালিয়াতি ও যোগসাজশের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন সার্টিফিকেট (ডিভিসি), ট্যাক্স সার্টিফিকেট, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট/বিআইএন, কাজের অভিজ্ঞতার সনদ, ব্যাংক সলভেন্সি, এফিডেভিটসহ প্রায় সব কাগজপত্রই জাল অথবা ভুয়া। তারপরেও এমন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) রিভিউয়ে বিষয়টি ধরা পড়েছে। রিভিউ প্যানেল-৫ গত ৪ অক্টোবর-২০২৬ এক আদেশে সংশ্লিষ্ট নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ), কার্যাদেশ ও সম্পাদিত চুক্তি বাতিল এবং দরপত্রগুলো পুনরায় সঠিকভাবে মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছে। তবে জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নন-ইডিসিএল ওষুধ, কেমিক্যাল রি-এজেন্ট ও মেডিকেল ফার্নিচার কেনার জন্য তিনটি টেন্ডার আহ্বান করা হয়। সংশ্লিষ্ট টেন্ডার আইডি যথাক্রমে ১৩১৯০৯৮, ১৩১৯১০২ ও ১৩১৯১০৪। নথি অনুযায়ী, দরপত্রে অংশ নেয় মোট ৯টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ছয়টিকে নন-রেসপনসিভ ঘোষণা করা হয়। বিপরীতে তিনটি প্রতিষ্ঠানকে রেসপনসিভ দেখিয়ে তাদের অনুকূলে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড ও কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যুক্তিসংগত সর্বনিম্ন দরদাতাদের বাদ দিয়ে প্রাক্কলিত দরের প্রায় ৯৮-৯৯ শতাংশের কাছাকাছি দর দেওয়া প্রতিষ্ঠানকে রেসপনসিভ দেখানো হয়েছে। এতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস-২০২৫-এর স্পষ্টত লঙ্ঘন হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি অর্থের প্রতিযোগিতামূলক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত দামে পণ্য কেনা ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি বিধি অনুযায়ী দরপত্রের প্রতিটি কাগজ যাচাই-বাছাইয়ে বাধ্যবাধকতা থাকলেও টেন্ডার ইভালুয়েশন কমিটি সেটি এড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, যার ক্ষেত্রে কমিটি কোনোরূপ অনলাইন ভেরিফিকেশন না করেই ৪১টি শর্তের সব কটিই ‘পূরণ হয়েছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করে। এমনকি বিপিপিএর রিভিউ প্যানেলের কাছেও ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ কোনো ই-জিপি রেকর্ড বা সঠিক নথিপত্র প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়। রিভিউ প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, একটি প্রতিষ্ঠানের দাখিল করা অডিট রিপোর্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা পাওয়া যায়নি। এমনকি ডিভিসি নম্বর অনলাইনে যাচাই করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে তা পাওয়া যায়নি। দাখিল করা কিছু নথি প্রকৃতপক্ষে অন্য প্রতিষ্ঠানের। একটি নথিতে কেডিএফ করপোরেশনের ডিভিসি নম্বর ব্যবহার করা হয়। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট ডিভিসি অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের। শুধু ডিভিসি নয়; ট্যাক্স সার্টিফিকেট, ট্রেড লাইসেন্স, ভ্যাট/বিআইএন, কাজের অভিজ্ঞতার সনদ, ব্যাংক সলভেন্সি, এফিডেভিটসহ প্রায় সব নথি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
ক্রয়সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, মূল্যায়ন কমিটির এই ভূমিকা কেবল অদক্ষতা নয়, বরং ক্রয়কারী কর্তকর্তা এবং ঠিকাদারের যোগসাজশের সুস্পষ্ট আলামত বহন করে।
কার্যাদেশ পাওয়া নেক্সট জেন ইন্টারন্যাশনালের ট্রেড লাইসেন্সের তারিখ ২ জুলাই-২০২৬, টিআইএন ২৪ মার্চ-২০২৬ এবং বিআইএন ১৭ মে-২০২৬–এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট নথিতে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ দরপত্রে অংশগ্রহণের সময় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বয়স ছিল খুবই কম। অথচ দরপত্রে অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতার বিভিন্ন শর্ত পূরণের দাবি করা হয়েছে। নবীন একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে এমন অভিজ্ঞতা বা যোগ্যতার নথি দাখিল করল? আর সেই নথি যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কীভাবে সেগুলো গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠানকে রিসপন্সিভ করেছেন এমন প্রশ্ন সংশ্লিষ্টদের।
প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রতিকার না পেয়ে অভিযোগকারী বিপিপিএ রিভিউ প্যানেলে আপিল করে। আপিল শুনানি চলাকালে সব অপকর্ম ফাঁস হওয়ার উপক্রম হলে মুলাদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ চিকিৎসাসেবা ও জনস্বার্থের বিষয়টি সামনে এনে দ্রুত ক্রয়-প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তড়িঘড়ি করে নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড-এনওএ এবং কার্যাদেশ প্রদান করে।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নথি যাচাই করে বিপিপিএর রিভিউ প্যানেল-৫ গত ৪ অক্টোবরের আদেশে সংশ্লিষ্ট এনওএ, কার্যাদেশ এবং সম্পাদিত চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি দরপত্রগুলো পুনরায় যথাযথভাবে মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মুলাদী স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. সৈয়দ ফজলে রাব্বী বলেন, ‘দরপত্র যাচাই প্রক্রিয়া যথাসম্ভব স্বচ্ছভাবে করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারপরেও ভুল থাকতে পারে।’ বিপিপিএর রিভিউ প্যানেল-৫ কার্যদেশ বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে, এ ক্ষেত্রে কী করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেনাকাটা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এখন চাইলেও সেটি বাদ দেওয়া যাবে না। আমরা বিপিপিএ রিভিউ প্যানেলে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানাব।’
নাম প্রকশে অনিচ্ছুক একজন প্রকিউরমেন্ট বিশেষজ্ঞ বলেন, রিভিউ প্যানেল কার্যাদেশ বাতিল করেছে–এটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু যদি সত্যিই ভুয়া ডিভিসি, অন্য প্রতিষ্ঠানের নথি, জাল অডিট রিপোর্ট কিংবা অসত্য অভিজ্ঞতার কাগজ ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নথি জালিয়াতির উৎস খুঁজে বের করা জরুরি। পাশাপাশি দরপত্র যাচাই ও মূল্যায়ন কমিটির সদস্যদের ভূমিকাও বিবেচনায় আনতে হবে, এটি নিছক অবহেলা, নাকি কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা তা বের হওয়া উচিত। অন্যায়কারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, আরু করপোরেশন, জাজ করপোরেশন, কেডিএফ করপোরেশন ছাড়াও এই চক্রের উল্লেখযোগ্য লাইসেন্স হচ্ছে জাজ এন্টারপ্রাইজ, এনএস ট্রেডিং করপোরেশন, আর এস ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, আরএম ট্রেডার্স, পিকেএস ট্রেডার্স, এনএস ট্রেডিং করপোরেশন, নেক্সট জেন ইন্টারন্যাশনাল, এনএস ট্রেডিং, কেডিএফ ইন্টারন্যাশনাল, আয়মান করপোরেশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে একচেটিয়া টেন্ডার মাফিয়া চক্র গঠনের মাধ্যমে ক্ষমতা ও অর্থ শক্তি ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার টেন্ডার হাতিয়ে নেওয়া হয়।



