
বাংলার দুর্গাপূজা মানেই ঢাকের বাদ্য, আলোর ঝলকানি, মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের ভিড় আর উৎসবের উচ্ছ্বাস। তবে এই উৎসবের আবহ গড়ে তুলতে গানের ভূমিকাও বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলা চলচ্চিত্রের গান ও আধুনিক বাংলা সংগীত দুর্গাপূজার আনন্দের সঙ্গে মিশে রয়েছে।
বিশেষ করে আশি ও নব্বইয়ের দশকের গানগুলো আজও বহু বাঙালির কাছে নস্টালজিয়ার এক বিশেষ নাম।
বাপ্পি লাহিড়ী ও আর. ডি. বর্মণের সুর, কিশোর কুমার ও আশা ভোঁসলের কণ্ঠ- সব মিলিয়ে সেই সময়ের গান কখনো প্রেমের আবেশ তৈরি করেছে, কখনো আবার উৎসবের মণ্ডপে ছড়িয়ে দিয়েছে নাচের উন্মাদনা। সময় বদলেছে, বদলেছে গানের ধরন ও শোনার মাধ্যম; তবু পুরোনো দিনের সেই সুরের আবেদন আজও ফুরিয়ে যায়নি।
দুর্গাপূজার স্মৃতি, প্রেম ও উৎসবের আবহের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা তেমনই কয়েকটি গানের কথা তুলে ধরা হলো।
কথা হয়েছিল: ত্রয়ী (১৯৮২)
দুর্গাপূজার সন্ধ্যার তারুণ্যভরা উচ্ছ্বাসের কথা উঠলে ‘কথা হয়েছিল’ গানটির কথা মনে পড়ে যায়। আর. ডি. বর্মণের সুরে এবং আশা ভোঁসলে ও কিশোর কুমারের কণ্ঠে গানটি পেয়েছে প্রাণবন্ত রূপ। ত্রয়ী চলচ্চিত্রে দেবশ্রী রায় ও মিঠুন চক্রবর্তীর উপস্থিতি গানটির রোমান্টিক আবেদনে বাড়তি মাত্রা যোগ করে।
ছন্দময় সুর ও প্রেমের মিষ্টি অনুভূতি গানটিকে শ্রোতাদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয় করে তুলেছিল। পূজামণ্ডপের ভিড় কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে হঠাৎ জমে ওঠা নাচের আসর- সব ক্ষেত্রেই গানটি মানানসই। কয়েক দশক পেরিয়েও এর সুর বিভিন্ন প্রজন্মের শ্রোতাকে আনন্দে মাতিয়ে তুলতে পারে।
এমন মধুর সন্ধ্যায়: একান্ত আপন (১৯৮৭)
একান্ত আপন চলচ্চিত্রের জন্য আর. ডি. বর্মণের সুরে তৈরি এই গানে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ মিশে গেছে স্নিগ্ধ বাদ্যযন্ত্রের সুরের সঙ্গে। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে পাড়ার পূজামণ্ডপে যখন মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে, তখন এমন একটি গান উৎসবের পরিবেশকে করে তুলতো আরও মধুর। এর রোমান্টিক আবেদন ও কোমল সুর সেই সময়ের বাংলা চলচ্চিত্রের গানপ্রেমীদের মনে আজও বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
আর কত রাত একা থাকব: চোখের আলোয় (১৯৮৯)
উৎসবের কোলাহল যখন ধীরে ধীরে কমে আসে, রাতের পরিবেশ হয়ে ওঠে শান্ত, তখন ‘আর কত রাত একা থাকব’ যেন এক অন্য অনুভূতির দরজা খুলে দেয়। বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে গানটি চোখের আলোয় চলচ্চিত্রে দেবশ্রী রায়ের ওপর চিত্রায়িত হয়েছিল। রোমান্টিক সুরের সঙ্গে একাকিত্বের মৃদু ছোঁয়া গানটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র আবেদন। সংযত সংগীতায়োজনের মধ্যে আশা ভোঁসলের কণ্ঠ বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। পূজার প্রাণচঞ্চল গানের ভিড়ে এই গান যেন একটু থেমে নিজের অনুভূতিতে ডুবে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
চোখে চোখে কথা বলো
দুর্গাপূজার জনপ্রিয় গান মানেই যে সবই চলচ্চিত্রের গান, তা নয়। বাংলা আধুনিক গানের ধারায় ‘চোখে চোখে কথা বলো’ তার মিষ্টি সুর ও রোমান্টিক আবেদনের মাধ্যমে শ্রোতাদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। আর. ডি. বর্মণের সুরের মাধুর্য গানটিকে সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন শ্রোতার কাছেও পৌঁছে দিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে কলকাতায় এক কনসার্টে সুনিধি চৌহানের পরিবেশনায় গানটি আবারও শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। প্রায় নিখুঁত বাংলা উচ্চারণে তার পরিবেশনা বাংলা গানের প্রতি শ্রোতাদের ভালোবাসার কথাই যেন নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
সন্ধ্যাবেলায়
আর. ডি. বর্মণের সুরে ‘সন্ধ্যাবেলায়’ আরেকটি রোমান্টিক গান, যার মাধুর্য ধরা পড়ে স্নিগ্ধ ছন্দ ও আশা ভোঁসলের কণ্ঠে। সন্ধ্যা থেকে রাতের দিকে এগিয়ে চলা সময়ের আবহ যেন গানের সুরে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে।
পূজামণ্ডপে বাজতে থাকা উদ্দীপনাময় গানগুলোর তুলনায় এর আবেদন অনেকটাই আলাদা। কোলাহলের মাঝেও গানটি তৈরি করতে পারে একান্ত, কোমল ও রোমান্টিক পরিবেশ। উৎসবের ব্যস্ততার মধ্যে এমন গান শ্রোতাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অনুভূতির জগতে।
চিরদিনই তুমি যে আমার: অমর সঙ্গী (১৯৮৭)
বাংলা চলচ্চিত্রের প্রেমের গানের তালিকায় ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ একটি বিশেষ পরিচিত নাম। বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে কিশোর কুমারের কণ্ঠে গানটি পেয়েছে অনন্য আবেদন। অমর সঙ্গী চলচ্চিত্রে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় ও আয়েশা ঝুলকার উপস্থিতি গানটির সঙ্গে প্রেমের স্মৃতিকে আরও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে দিয়েছে।
দুর্গাপূজার সময় পাড়ার মণ্ডপে এই গান বেজে উঠলে অনেকের মনেই ফিরে আসে কৈশোর ও তারুণ্যের দিনগুলো। প্রথম প্রেম, পুরোনো বন্ধুত্ব কিংবা বাংলা সিনেমা দেখে বড় হয়ে ওঠার স্মৃতি- সব মিলিয়ে গানটি যেন এক সময়ের আবেগকে ধরে রেখেছে। প্রজন্ম বদলালেও এর জনপ্রিয়তা বাংলা গানের চিরসবুজ ঐতিহ্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়।
মনে পরে রুবি রায়: ১৯৬৯
আশি ও নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় গানগুলোর চেয়ে পুরোনো হলেও ‘মনে পরে রুবি রায়’ আজও শ্রোতাদের কাছে সমান পরিচিত। আর. ডি. বর্মণের সুর ও কণ্ঠে, শচীন ভৌমিকের কথায় গানটি ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় এবং দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। গানটির স্মৃতিমধুর আবহ ও সহজে মনে গেঁথে যাওয়া সুর একে চিরসবুজ গানের তালিকায় জায়গা দিয়েছে। দুর্গাপূজার উৎসবমুখর পরিবেশে এমন গান বাজলে পুরোনো দিনের স্মৃতি যেন নতুন করে ফিরে আসে। সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও গানটির আবেদন প্রমাণ করে, ভালো সুরের কোনো নির্দিষ্ট বয়স হয় না।
আজ এই দিনটাকে: অন্তরালে (১৯৮৫)
বাপ্পি লাহিড়ীর সুরে এবং কিশোর কুমারের কণ্ঠে ‘আজ এই দিনটাকে’ এমন একটি গান, যা উৎসবের সকালের আবহের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়। বাংলা সংগীতের বহু জনপ্রিয় গানের মতো এটিও চলচ্চিত্রের মূল প্রেক্ষাপট ছাড়িয়ে শ্রোতাদের দৈনন্দিন স্মৃতি ও অনুভূতির অংশ হয়ে উঠেছে।
দুর্গাপূজার সকালে নতুন দিনের ব্যস্ততা, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার আনন্দ কিংবা মণ্ডপে যাওয়ার প্রস্তুতির মধ্যে এমন গান উৎসবের অনুভূতিকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে। গানটির পরিচিত সুর শ্রোতাদের মনে জাগিয়ে তোলে পুরোনো দিনের স্মৃতি এবং উৎসবকে ঘিরে থাকা আবেগ। টেলিগ্রাফ ইণ্ডিয়া
আরও পড়ুন
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…

