জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষে (জাগৃক) লটারির মাধ্যমে কর্মকর্তা পদায়নের আড়ালে কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন ও পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগ উঠেছে। সংস্থার পরিচালক ফকির মো. মুনওয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে এই বদলি-বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের দাবি, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক পদে পদায়নের জন্য ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হয়েছে। এ নিয়ে সংস্থাটির প্রকৌশলী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, জাগৃকের উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর অনুমোদিত ১৭টি পদে একযোগে লটারির মাধ্যমে পদায়নের কথা ছিল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ লটারির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পরিচালক ফকির মুনওয়ার হোসেনের প্রভাবে এসব পদ আলাদা রাখা হয়, যাতে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের পছন্দের কর্মস্থলে পদায়ন নিশ্চিত করা যায়।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের প্রশ্ন, অনুমোদিত ১৭টি পদের মধ্যে কয়েকটি পদ কোন নীতিমালার ভিত্তিতে লটারির বাইরে রাখা হয়েছে। এসব পদ বাদ দেওয়ার যৌক্তিক কারণও স্পষ্ট করা হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ। পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়ায় লটারির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লটারির আগে মৌখিক পরীক্ষা বা ভাইভা আয়োজন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, লটারির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও তাঁদের ডেকে পছন্দের কর্মস্থলের তালিকা লিখে নেওয়া হয়। এতে লটারির উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের সুবিধাজনক পদে বসানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ কিছু কর্মকর্তাকেও অর্থের বিনিময়ে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অর্থ লেনদেনের পক্ষে নির্দিষ্ট ব্যাংক নথি বা আর্থিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফকির মুনওয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বদলি-পদায়নের পাশাপাশি সংস্থার ভূমি ও সম্পত্তি শাখার ফাইল নিষ্পত্তিতে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের দাবি, প্রশাসনিক প্রভাব ব্যবহার করে এসব কার্যক্রমে আর্থিক সুবিধা আদায় করা হচ্ছে। তবে কোন ফাইলের বিপরীতে কত টাকা নেওয়া হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
পরিচালক মুনওয়ার হোসেনের অতীত প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের সময় তিনি ঢাকার বিভাগীয় কমিশনারের পিএস ও কালেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদেশে বাংলাদেশ মিশনে কর্মরত থাকাকালে সরকারের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে ওই অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন, পদোন্নতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বা সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি পাওয়া যায়নি। ফলে পদোন্নতি না পাওয়ার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
জাগৃকের পদায়ন প্রক্রিয়ায় চাকরির মেয়াদসংক্রান্ত বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, লটারির মাধ্যমে যেসব কর্মকর্তাকে বদলির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, তাঁদের অনেকের বর্তমান কর্মস্থলে তিন বছর পূর্ণ হয়নি।
এ ছাড়া বদলি ও পদায়নসংক্রান্ত একটি পূর্ববর্তী অফিস আদেশ দীর্ঘদিন বাস্তবায়ন না করে ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে। ওই আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণ এবং নতুন লটারির সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়েও ব্যাখ্যা দাবি করেছেন প্রকৌশলীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, ১৭টি অনুমোদিত পদেই একই নিয়মে উন্মুক্ত লটারির আয়োজন করা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো আলাদা রেখে আংশিক লটারি আয়োজন করলে নিরপেক্ষ পদায়নের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।
এদিকে পদায়ন কমিটির সভাপতি এবং জাগৃকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) হাছিনা বেগমের বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
হাছিনা বেগম জানান, কমিটির সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও পদায়ন প্রক্রিয়ার অনেক বিষয় তাঁর জানা নেই। পুরো বিষয়টি সংস্থার চেয়ারম্যানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে পরিচালক ফকির মো. মুনওয়ার হোসেন স্বীকার করেছেন, সংস্থার চেয়ারম্যান বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিয়ে থাকেন। লটারির আগে ভাইভা আয়োজনের বিষয়ে দু-একজন কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলেও জানান তিনি।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ প্রসঙ্গে মুনওয়ার হোসেন বলেন, কর্তৃপক্ষ চাইলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখতে পারে।
তাঁর এই বক্তব্যের পরও পদায়ন প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না, গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো কেন লটারির বাইরে রাখা হয়েছে এবং মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দাবি, লটারির মাধ্যমে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে অনুমোদিত সব পদের ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। পাশাপাশি পদায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।
জাগৃকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব অভিযোগ তদন্তে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। বিশেষ করে কথিত ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেন, পদায়নে অনিয়ম এবং ভূমি ও সম্পত্তি শাখায় কমিশন আদায়ের অভিযোগ নথিভিত্তিক অনুসন্ধানের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
১৭টি পদের অনুমোদিত তালিকা, লটারির সিদ্ধান্ত, মৌখিক পরীক্ষার নথি, পূর্ববর্তী অফিস আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।




