চট্টগ্রামের বেকারি ও মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফুলকলি ফুড প্রোডাক্টসের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র না দেওয়া, ওভারটাইমের মজুরি পরিশোধ না করা, ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন এবং কর্মস্থলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলা করেছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম মহানগর দ্বিতীয় শ্রম আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার নম্বর ৬৬/২৬। চট্টগ্রামের বাকলিয়ায় অবস্থিত ফুলকলির প্রধান কারখানায় একাধিক পরিদর্শনে পাওয়া অনিয়মের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেয় অধিদপ্তর।
পরিদর্শনসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি প্রথমবার ফুলকলির কারখানা পরিদর্শন করেন শ্রম পরিদর্শকেরা। এ সময় শ্রম আইন ও বিধিমালার বিভিন্ন শর্ত পালনে ঘাটতি পাওয়া যায়। এসব অনিয়ম সংশোধনের জন্য ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হয়।
পরবর্তী সময়ে ৪ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় কারখানা পরিদর্শন করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাঁদের প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের পরিদর্শনে চিহ্নিত অনিয়মগুলো সংশোধন করা হয়নি। বরং নতুন কিছু ঘাটতিও পাওয়া গেছে।
এরপর ১৭ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পরিচালক ও মহাব্যবস্থাপকের কাছে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চূড়ান্ত তাগিদপত্র পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগে শেষ পর্যন্ত মামলা দায়ের করে অধিদপ্তর।
শ্রম পরিদর্শন প্রতিবেদনে ফুলকলির কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের চাকরির প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও আইনগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র দেওয়া হয়নি। সার্ভিস বই এবং ছুটির রেজিস্টারও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি।
এ ছাড়া শ্রমিকদের অতিরিক্ত কাজের মজুরি পরিশোধ না করা এবং সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সাপ্তাহিক ছুটি, ক্ষতিপূরণমূলক ছুটি এবং অর্জিত ছুটির হিসাব ও প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত না করার বিষয়ও পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
শ্রমিকদের বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তিভিত্তিক মজুরিতে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত একটানা কাজ করতে হয়। অথচ অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার জন্য নির্ধারিত ওভারটাইমের মজুরি দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, অসুস্থতা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে কোনো দিন কাজে অনুপস্থিত থাকলে পুরো দিনের মজুরি কেটে নেওয়া হয়। এমনকি নিয়ম অনুযায়ী সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করলেও মজুরি কাটার অভিযোগ রয়েছে।
কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও একাধিক অনিয়ম চিহ্নিত করেছেন শ্রম পরিদর্শকেরা। প্রতিবেদনে জরুরি বহির্গমনপথ যথাযথভাবে চিহ্নিত না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অগ্নিনিরাপত্তা মহড়া আয়োজনের দাপ্তরিক প্রমাণও পরিদর্শনের সময় দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া কারখানার বৈদ্যুতিক ওয়্যারিংয়ের উপযুক্ততার সনদ উপস্থাপন করতে না পারা এবং শ্রমিকদের কর্মঘণ্টাসংক্রান্ত নোটিশ প্রদর্শন না করার অভিযোগও রয়েছে।
শ্রমিকদের নিয়োগসংক্রান্ত নথি, মজুরি পরিশোধ, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার এসব অনিয়ম বাংলাদেশ শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালার আলোকে মামলায় তুলে ধরা হয়েছে।
মামলা ও অভিযোগের বিষয়ে ফুলকলি ফুড প্রোডাক্টসের জেনারেল ম্যানেজার এ সবুরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর তাঁদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনে মামলা করেছে, সেটি অধিদপ্তরের বিষয়। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ আইনিভাবেই এর জবাব দেবে।
তিনি আরও জানান, তাঁরা এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাননি। নোটিশ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনের প্রতি তাঁদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মামলা দায়েরের আগে প্রতিষ্ঠানটিকে দুই দফায় অনিয়ম সংশোধনের নোটিশ ও তাগিদপত্র পাঠানো হয়েছিল। নোটিশ পাঠানো এবং তা গ্রহণের বিষয়ে উভয় পক্ষের বক্তব্যে যে পার্থক্য রয়েছে, সেটি সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি থেকে যাচাই করা প্রয়োজন।
মামলায় উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মধ্যে শ্রমিকদের নিয়োগসংক্রান্ত অধিকার, নির্ধারিত মজুরি, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার পারিশ্রমিক এবং অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা ও আইন লঙ্ঘনের দায় আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
চট্টগ্রাম মহানগর দ্বিতীয় শ্রম আদালতে দায়ের করা মামলার পরবর্তী কার্যক্রমে শ্রম পরিদর্শন প্রতিবেদন, সংশোধনমূলক নোটিশ, মজুরি ও ছুটির রেজিস্টার এবং কারখানার নিরাপত্তাসংক্রান্ত নথি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।



