বন্ডে প্রভাব বিস্তার থেকে শতকোটি টাকার সম্পদ, কাস্টমস কর্মকর্তা রাসেলকে ঘিরে অভিযোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন কাস্টমস ও ভ্যাট বিভাগের সম্প্রতি পদোন্নতি পাওয়া সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা এবং নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।

কাস্টমস ক্যাডারের ১১তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অভিযোগে তাঁর চাকরিজীবনের বিভিন্ন সময়ের পোস্টিং, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, অডিটে অনিয়ম এবং সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে রাসেল আল মামুনের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

সহকারী কমিশনার রাসেল আল মামুন

বন্ড কমিশনারেটে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, অবিভক্ত কাস্টম বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনকালে রাসেল আল মামুন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন।

বিশেষ করে ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রিভেন্টিভ কার্যক্রম এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস তদারকির সুযোগ ব্যবহার করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, রাজস্ব ফাঁকি রোধের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অভিযান ও রাতের টহল পরিচালনা করা হতো। পরে অর্থের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়া হতো।

অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, কিছু বন্ড প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এককালীন অর্থের পাশাপাশি নিয়মিত মাসিক অর্থ আদায়ের ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছিল।

তিন বছরে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগও এতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অঙ্কের পক্ষে কোনো নিরীক্ষিত আর্থিক নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

সাবেক কমিশনারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাজ করার অভিযোগ

অভিযোগে রাসেল আল মামুনের সঙ্গে এনবিআরের সাবেক এক সদস্য ও তৎকালীন এক বন্ড কমিশনারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও বলা হয়েছে।

মোংলা কাস্টম হাউসে কর্মরত থাকার সময় ওই কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, আমদানিকৃত গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ভারী পণ্যের শুল্কায়ন এবং খালাসে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা করা হতো।

পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তা ঢাকা বন্ড কমিশনারেটে বদলি হয়ে এলে ২০১৮ সালে রাসেলকেও সেখানে নিয়ে আসা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

সেখানে তিনি হেডকোয়ার্টার্স ও প্রিভেন্টিভ বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান।

গুলশান ও টঙ্গী থেকে মাসিক অর্থ আদায়ের অভিযোগ

পরে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটে দায়িত্ব পালনের সময়ও রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ ওঠে।

লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, গুলশান ও টঙ্গী এলাকার বিভিন্ন বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হতো।

গুলশান এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে মাসে প্রায় এক কোটি টাকা এবং টঙ্গী সার্কেল থেকে আরও ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব অর্থ লেনদেনের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।

হোসেন ডাইংয়ের অডিটে ৩৫ লাখ টাকার চুক্তির অভিযোগ

রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিষ্ঠানের অডিট ঘিরেও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আনোয়ার গ্রুপের মালিকানাধীন হোসেন ডাইংয়ের অডিট নিষ্পত্তির জন্য ৩৫ লাখ টাকার একটি গোপন আর্থিক সমঝোতা হয়েছিল।

অভিযোগকারীর দাবি, পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ছাড়াই অডিট ফাইল অনুমোদন দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে এনবিআরে লিখিত অভিযোগ গেলে নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় এক কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া যায়।

তবে এই তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা এনবিআরের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের কপি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

কমলাপুর আইসিডিতেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ

কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো বা আইসিডিতে দায়িত্ব পালনের সময়ও রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো।

কেউ অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে চালান আটকে দেওয়া কিংবা মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

কিছু আমদানিকারক তৎকালীন কমিশনার এবং এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন বলেও দাবি রয়েছে।

তবে ওই অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

সম্পদের উৎস নিয়েও প্রশ্ন

লিখিত অভিযোগে রাসেল আল মামুনের সম্পদের পরিমাণ এবং তার বৈধ উৎস নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি আয়কর নথিতে ঘোষিত সম্পদের তুলনায় বাস্তবে তাঁর সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি।

ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে বড় আকারের বাড়ি নির্মাণ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি কেনার কথাও অভিযোগে বলা হয়েছে।

ঢাকায় একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট এবং গাড়ির মালিকানার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, কিছু সম্পদ তাঁর নিজের নামে না রেখে বাবা-মা, ভাই-বোন ও নিকটাত্মীয়দের নামে রাখা হয়েছে।

তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, বাজারমূল্য এবং অর্থের উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পারিবারিক মামলার কথাও অভিযোগে

রাসেল আল মামুনের বিরুদ্ধে একটি পারিবারিক মামলার কথাও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, তাঁর স্ত্রী নির্যাতন ও যৌতুক দাবির অভিযোগে আদালতে মামলা করেছেন।

তবে মামলাটির বর্তমান অবস্থা, অভিযোগপত্র কিংবা আদালতের সর্বশেষ আদেশের কপি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এসব অভিযোগের বিষয়ে রাসেল আল মামুনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

দুদকে অভিযোগ জমা পড়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগটি যাচাইয়ের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে পর্যালোচনা হতে পারে।

তবে দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধান শুরু করেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগগুলো তদন্তে প্রমাণিত হলে বিষয়টি সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের উৎস, রাজস্ব প্রশাসনে জবাবদিহি এবং বন্ড ব্যবস্থাপনায় নজরদারি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে।

Scroll to Top