
তেহরান, ০৬ অক্টোবর – বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক শক্তি রাজনীতির জন্য ঘনিয়ে আসছে এক ভয়ংকর দুর্যোগের মেঘ! মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ায় সরাসরি আঘাত এসেছে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। একের পর এক ধ্বংস ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেলের প্রধান পাইপলাইন, আন্তর্জাতিক শোধনাগার, গ্যাস স্থাপনা এবং সমুদ্রে ভাসমান ডজন ডজন তেলের ট্যাংকার। এই নজিরবিহীন ধ্বংসস্তূপ আর অবরুদ্ধ সরবরাহ ব্যবস্থার হাজার কোটি (বিলিয়ন) ডলারের চরম মাশুল শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাসীকেই গুনতে হবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দুই বড় তেল উৎপাদনকারী দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
আন্তর্জাতিক ‘এনার্জি ইন্টেলিজেন্স ফোরামে’ বিশ্ব অর্থনীতির সামনে এই নির্মম ও আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরেছেন দুই তেল পরাশক্তি—সৌদি আরামকো এবং কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (কেপিসি) প্রধান নির্বাহীরা।
ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র ও হাজার কোটি ডলারের খেসারত
যুদ্ধের থাবায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার মূল চিত্র চোখ কপালে তোলার মতো:
অবকাঠামোর নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ: সংঘাতের সরাসরি শিকার হয়েছে তেল পরিবহনের মূল ধমনি পাইপলাইন, আন্তর্জাতিক গ্যাস কেন্দ্র, বিশ্বমানের শোধনাগার এবং সমুদ্রে থাকা তেলবাহী ট্যাংকারগুলো।
হাজার কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ: ক্ষতিগ্রস্ত এসব স্থাপনা মেরামত, পুনর্নির্মাণ ও নতুন বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করতে সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ ইতোমধ্যেই কয়েক হাজার কোটি (বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছেছে।
ভোক্তাদের ওপর চূড়ান্ত চাপ: উৎপাদক কোম্পানিগুলো পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে—এই বিশাল ব্যয় কোনোভাবেই কমানো বা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দর বৃদ্ধির মাধ্যমে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতেই নতুন করে মারাত্মক মূল্যস্ফীতি দেখা দিতে পারে।
কুয়েত ও সৌদির কড়া বার্তা: পশ্চিমা বিশ্ব ও আমদানিকারকদের দিতে হবে মাশুল
১. কুয়েত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (কেপিসি) সিইও শেখ নাওয়াফ আল-সাবাহ-এর সোজা হিসাব:
সংঘাতের আগে ইউরোপে ডিজেল ও জেট ফুয়েলের অন্যতম সেরা সরবরাহকারী ছিল কুয়েত। কিন্তু যুদ্ধের পর ইউরোপজুড়ে ডিজেলের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শেখ নাওয়াফ ইউরোপীয় দেশগুলোকে সোজা কথা জানিয়ে দিয়েছেন—ইউরোপ যদি নির্বিঘ্নে পরিশোধিত তেল ও ডিজেল আমদানির সুবিধা বজায় রাখতে চায়, তবে শুধু কুয়েতের ওপর দায় চাপিয়ে রাখলে চলবে না। ভোক্তাদের কাছাকাছি তেল মজুত ও পরিবহনের জন্য ইউরোপ মহাদেশেই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে পশ্চিমা দেশগুলোকেও বিনিয়োগ করতে হবে।
২. সৌদি আরামকোর সিইও আমিন নাসের-এর দূরদর্শী পরিকল্পনা ও ২ বছরের খরা:
বিকল্প রুটে বৈচিত্র্য: পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরের বিপজ্জনক প্রচলিত সমুদ্রপথ বাদ দিয়ে বিকল্প নতুন পরিবহনের পথ খুঁজছে সৌদি আরামকো।
ধারণক্ষমতা ৩ গুণ বৃদ্ধি: সংকট মোকাবেলায় দেশের বাইরে থাকা আরামকোর তেল সংরক্ষণাগারগুলোর ধারণক্ষমতা ২ থেকে ৩ গুণ বাড়ানোর জোর চিন্তাভাবনা চলছে।
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ম্যাজিক: হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ বিকল্প পথ তৈরি করে দেয়। আমিন নাসের চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে জানান, সংঘাত শুরু হওয়ার পর মাত্র ১৪ দিন ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিশাল পাইপলাইনটির পুরো নির্মাণ ব্যয় উঠে এসেছে!
২ বছরের দীর্ঘ সংকট: নাসেরের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধ আজ থামলেও বিশ্বব্যাপী খালি হয়ে যাওয়া তেলের মজুত আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে প্রতিদিন অতিরিক্ত ২০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি মেটাতে হবে, যা স্বাভাবিক হতে অন্তত **দুই বছর** সময় লেগে যাবে!
‘হাতে এক ফোঁটা অতিরিক্ত তেল নেই!’ — সতর্ক করছে গ্লোবাল ট্রেডাররা
এনার্জি ইন্টেলিজেন্স ফোরামে শীর্ষ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তারাও জ্বালানি সংকট নিয়ে একই রকম আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন:
ভিটোল গ্রুপ (সিইও রাসেল হার্ডি): আন্তর্জাতিক এই পণ্য বাণিজ্যকারী প্রতিষ্ঠানের প্রধান জানান, পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে জরুরি ব্যবহারের জন্য অতিরিক্ত কোনো তেলের মজুত বলতে গেলে আর অবশিষ্ট নেই।
শেভরন করপোরেশন (সিইও মাইক উইর্থ): সাময়িকভাবে কৌশলগত বা স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (SPR) থেকে বাজারে তেল ছেড়ে ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা হলেও, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার চরম ভঙ্গুর ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ঝুলছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য শেষ বার্তা
সৌদি আরামকো ও কুয়েত পেট্রোলিয়ামের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন—তেল ও গ্যাসের অবকাঠামো কোনো অতিরিক্ত খরচ নয় যা চাইলেই বাদ দেওয়া যাবে। প্রতিটি আমদানিকারক ও উৎপাদক দেশকে এখন থেকেই বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরি ও জ্বালানি মজুদে বিশাল বিনিয়োগ করতে হবে। নতুবা মধ্যপ্রাচ্যের সামান্যতম যুদ্ধ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থবির করে দিতে পারে।
এনএন/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬


