তারুণ্যের অন্যতম স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো প্রবল আবেগ এবং বিপরীত লিঙ্গের প্রতি মনোদৈহিক আকর্ষণ। এই সংবেদনশীল বয়সে অনেকেই ক্ষণিক মুগ্ধতা বা তীব্র জৈবিক টানকে শাশ্বত ‘ভালোবাসা’ বলে ভুল করে বসেন।
কোনো যুগল যখন ইসলামের নির্ধারিত সীমারেখা অতিক্রম করে বিবাহবহির্ভূত ঘনিষ্ঠতায় জড়িয়ে পড়ে, তখন অন্তরে জন্ম নেয় তীব্র আত্মগ্লানি ও মানসিক অস্থিরতা। বিশেষ করে একজন বিশ্বাসী তরুণ বা তরুণীর মনে চরম নৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়—ভালোবাসার নামে এই আচরণ কি ইসলাম অনুমোদন করে? আর যদি তা ভুল হয়ে থাকে, তবে আল্লাহর কাছে পাপমুক্তির উপায় কী?
ইসলাম নারী ও পুরুষের পারস্পরিক আকর্ষণকে স্বভাবজাত বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে বৈধ বিয়ের মাধ্যমে পবিত্র পারিবারিক কাঠামোয় রূপ দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
প্রেম বনাম জৈবিক মোহ
অনেকেই সঙ্গীর নৈতিক চরিত্র, মানসিক পরিপক্বতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি সামঞ্জস্যের বিষয়টি বিবেচনা না করে নিছক বাহ্যিক রূপ ও শারীরিক আকর্ষণের টানে ‘প্রেম’ ভাবতে শুরু করেন।
এটি মূলত সাময়িক আবেগপ্রবণ মোহ। ইমাম ইবনুল কাইয়িম ভালোবাসা ও অন্ধ মোহের পার্থক্য তুলে ধরে লিখেছেন, যে ভালোবাসার ভিত্তি শুধু ইন্দ্রিয়সুখ ও শারীরিক রূপের মোহের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তা রূপের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই হ্রাস পায় এবং দ্রুত কলহে রূপ নেয়; পক্ষান্তরে চারিত্রিক সৌন্দর্য, সততা ও আত্মিক পবিত্রতার ওপর যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা চিরস্থায়ী ও প্রশান্তিময় হয়। (ইবনুল কাইয়িম, রওজাতুল মুহিব্বিন ওয়া নুজহাতুল মুশতাকিন, পৃষ্ঠা: ১৭১-১৭২, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯২)
সেই প্রকৃত ভালোবাসা আসে বিয়ের মধ্য দিয়ে। দাম্পত্য ভালোবাসার স্বরূপ ব্যাখ্যা করে আল্লাহ–তাআলা বলেছেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো, তিনি তোমাদের মধ্য থেকেই সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জন্য সঙ্গিনী, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করতে পারো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা রুম, আয়াত: ২১)
ইসলামের অলঙ্ঘনীয় সীমারেখা
ইসলামের অকাট্য বিধান হলো, বৈধ বিবাহচুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে কোনো ‘গায়রে মাহরাম; (যাঁদের সঙ্গে বিয়ে বৈধ) নারী ও পুরুষের মধ্যে যেকোনো ধরনের শারীরিক স্পর্শ কিংবা নির্জনবাস নিষিদ্ধ। মহান আল্লাহ শুধু ব্যভিচারকেই নিষিদ্ধ করেননি, বরং ব্যভিচারের প্ররোচনা দেয় এমন সব পথ রুদ্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, ‘আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই এটি এক মারাত্মক অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৩২)
ইবনুল আরাবি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ব্যভিচারের নিকটবর্তী না হওয়ার অর্থ হলো এর যাবতীয় প্রাথমিক কারণ—যেমন অপলক দৃষ্টি, স্পর্শ, একান্তে নির্জনবাস ও অনর্থক বাক্যালাপ থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা; কেননা প্রাথমিক ধাপগুলো উন্মুক্ত রাখলে চূড়ান্ত পাপ থেকে বেঁচে থাকা মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। (ইবনুল আরাবি, আহকামুল কুরআন, ৩/৩৩-২৩৪, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৩)
কোনো স্খলনের পর বিবেককে অবশ করে পাপকে স্বাভাবিক ভাবার চেয়ে আল্লাহর ভয়ে অনুতপ্ত হওয়া এবং সংশোধনের পথ খোঁজা একজন সচেতন মুমিনের পরিচয়।
আবেগ সংবরণ
কোনো স্খলনের পর বিবেককে অবশ করে পাপকে স্বাভাবিক ভাবার চেয়ে আল্লাহর ভয়ে অনুতপ্ত হওয়া এবং সংশোধনের পথ খোঁজা একজন সচেতন মুমিনের পরিচয়। তীব্র কামনাবাসনার মুখেও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেকে নিবৃত্ত রাখার কষ্ট এক মহিমান্বিত ইবাদত।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি তার রবের সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় করেছে এবং নিজের আত্মাকে কুপ্রবৃত্তি ও কামনা-বাসনা থেকে বিরত রেখেছে, নিশ্চয় বেহেশত হবে তার স্থায়ী আবাস।’ (সুরা নাজিআত, আয়াত: ৪০–৪১)
আত্মশুদ্ধির পদ্ধতি
হতাশ না হয়ে অবিলম্বে মহান আল্লাহর দরবারে খাঁটি তওবা করা আবশ্যক। ইসলামে আল্লাহর ক্ষমার পরিধি মানুষের যেকোনো পাপের চেয়েও সুবিশাল।
আল্লাহ–তাআলা ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং তাঁদের ভালোবাসেন যাঁরা পবিত্রতা অর্জন করেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২২)
তওবার প্রায়োগিক শিক্ষা হলো, নিষ্ঠার সঙ্গে অজু করে নির্জনে দুই রাকাত ‘সালাতুত তাওবা’ আদায় করা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো বান্দা যখন কোনো পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে, অতঃপর উত্তমরূপে অজু করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দেন।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৫২১)
ইবনে কুদামা আল-মাকদিসি উল্লেখ করেছেন, তওবার পূর্ণাঙ্গতার জন্য তিনটি বিষয় বাধ্যতামূলক, অতীতের পাপের ওপর অন্তরের গভীর অনুশোচনা, তাৎক্ষণিকভাবে সেই পাপের পরিবেশ ত্যাগ করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো সে কাজে লিপ্ত না হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করা। (আল-মাকদিসি, মুখতাসারু মিনহাজিল কাসিদিন, পৃষ্ঠা: ২৭৪, মাকতাবাতু দারুল বায়ান, দামেস্ক, ১৯৭৮ খ্রি.)
উত্তরণের কার্যকর পদক্ষেপ
আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও পাপের আবহ থেকে বেরিয়ে আসতে বাস্তবমুখী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:
১. নির্জনতা বর্জন: বিয়ে সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত একান্ত সাক্ষাৎ, নির্জনবাস তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করতে হবে। রাসুল (সা.) সতর্ক করেছেন, ‘কোনো পুরুষ যখন কোনো বেগানা নারীর সঙ্গে নির্জনে একাকী হয়, তখন তাদের তৃতীয় সঙ্গী হয় শয়তান।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২১৬৫)
২. নিয়মিত রোজা পালন: রাসুল (সা.) যুবসমাজকে দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, ‘হে যুবসমাজ, তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য রয়েছে সে যেন বিয়ে করে… আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন নিয়মিত রোজা রাখে; কেননা রোজা তার প্রবৃত্তির তাড়নাকে নিয়ন্ত্রণ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৬৬)
৩. ত্যাগের মহৎ প্রতিদান স্মরণ: রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যা-কিছু ত্যাগ করবে, আল্লাহ তোমাকে তার চেয়েও বহুগুণ উত্তম কিছু দান করবেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২০৭৩৯)



