
ফেনী, ০১ অক্টোবর – রাজনীতির মাঠে সমীকরণ বদলায়, কিন্তু পুরোনো সম্পর্কের ধরন কি সত্যিই বদলায়? ফেনীর ফুলগাজীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের ঝড় তুলেছে। স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর যাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল, তাদের অতীত ও বর্তমানের যোগসাজশ এবার সরাসরি জনসমক্ষে নিয়ে এলেন সরকারপ্রধান।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে ফেনীর ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষের কর্মসূচিহীনতা এবং ‘গুপ্ত বাহিনীর’ সাথে স্বৈরাচারী শক্তির আঁতাতের ইতিহাস তুলে ধরে কড়া বার্তা দেন।
স্বৈরাচার ও গুপ্ত বাহিনীর যোগসাজশ: যা বললেন প্রধানমন্ত্রী
জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তারেক রহমান অতীত ও বর্তমানের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট টেনে আনেন। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ভূমিকা নিয়ে তিনি বিশদ বিশ্লেষণ দেন:
ঐতিহাসিক আঁতাত: তারেক রহমান অভিযোগ করেন, স্বৈরাচার ও ‘গুপ্ত’ হিসেবে অভিহিত গোষ্ঠী মূলত সবসময় একসঙ্গেই ছিল। ‘৯১-এর নির্বাচন, ‘৮৬-এর নির্বাচন কিংবা সাম্প্রতিক নির্বাচন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা পর্দার অন্তরালে থেকে এক হয়ে কাজ করেছে।
রাজপথের অনুপস্থিতি: গত ১৭ বছরে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপর চলা জেল-জুলুম, হত্যা ও গায়েবি মামলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, যখন সাধারণ মানুষ ও বিএনপি রাজপথে আন্দোলন করছিল, তখন এই তথাকথিত দলগুলোকে রাজপথে দেখা যায়নি।
এক দফা’র আড়ালে অরাজকতা: দেশের উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত করতে একটি গোষ্ঠী দেশে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উন্নয়ন কর্মসূচি বনাম ক্ষমতালিপ্সার রাজনীতি
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সরকারের সাম্প্রতিক জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলোর সাথে বিরোধী শিবিরের কর্মসূচির এক সুস্পষ্ট তুলনা উঠে আসে। বিএনপি সরকারের রূপকল্প ও কার্যকরের রূপরেখা তুলে ধরে তিনি বলেন:
১. জনগণের সরাসরি সুবিধা: বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সম্মানি ভাতা, খালকাটা কর্মসূচি এবং উপজেলা হাসপাতালগুলোকে ৫০ শয্যা থেকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
২. প্রতিপক্ষের শূন্য ঝুলি: যারা আজ আন্দোলনের নামে ‘এক দফা’ বা অরাজকতা তৈরি করছে, জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে তাদের কোনো দৃশ্যমান কর্মসূচি বা পরিকল্পনা নেই।
৩. ধর্মীয় প্রতারণার রাজনীতি: নির্বাচনের আগে নির্দিষ্ট একটি দল কর্তৃক ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে ব্যবসা বা “বেহেশতের টিকিট বিক্রির” মতো বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে তিনি এটিকে ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার পরিপন্থী ও চরম মুনাফিকি হিসেবে উল্লেখ করেন।
“যারা গুপ্ত রাজনীতি করে, স্বৈরাচারী রাজনীতি করে, যাদের কাছে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করার কোনো কর্মসূচি নেই, শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করে, তাদের ব্যাপারে দেশের মানুষকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে।” — প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
ফেনী সফরে বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন
জনসভার মূল রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী দিনভর ফেনীতে বিভিন্ন সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নেন:
সরাসরি সহায়তার শুভসূচনা: জনসভার শুরুতেই স্থানীয় সুবিধাভোগীদের মাঝে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানি ভাতা বিতরণ করা হয়।
কৃষি ও সেচ প্রকল্প: পরশুরামে মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন, যা ওই অঞ্চলের কৃষিতে বড় পরিবর্তন আনবে।
সবুজ শক্তি ও পরিবেশ: ফুলগাজীর বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ এবং জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় রুফটপ সোলার থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন।
বিএনপি সরকারের মূল বার্তা—রাজনীতি কেবল ক্ষমতায় যাওয়া বা অরাজকতা তৈরি করার কৌশল নয়; রাজনীতি হতে হবে জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের মাধ্যম। ফেনীর এই বিশাল সমাবেশ থেকে উঠে আসা বার্তা রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষ কর্মসূটিভিত্তিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়বে, নাকি রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়বে—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
এনএন/ ০১ অক্টোবর ২০২৬
১. ফেনীতে তারেক রহমান কবে বক্তব্য দেন?
১ অক্টোবর ২০২৬ বিকেলে ফেনীর ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২. ‘স্বৈরাচার ও গুপ্ত আবার এক হয়েছে’—এটি কার বক্তব্য?
এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য। তিনি ‘গুপ্ত’ হিসেবে উল্লেখ করা একটি রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে অতীতের স্বৈরাচারী শক্তির সম্পর্ক থাকার অভিযোগ করেন।
৩. ফেনীতে কতজন ফ্যামিলি কার্ড পাবেন?
ফুলগাজীতে ৫১০ জনের জন্য ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের কর্মসূচি ছিল।
৪. ফেনীতে কতজন কৃষক কৃষক কার্ড পাবেন?
ফেনী জেলায় ৭ হাজার ৬৪৩ জন কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড দেওয়ার কর্মসূচি ছিল।
৫. মুহুরী-কহুয়া প্রকল্পের ব্যয় কত?
‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (১ম পর্যায়)’-এর ব্যয় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা।


