প্রযুক্তিতে উন্নত বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতির দেশ জাপান এখন তীব্র কর্মক্ষম জনবল সংকটের মুখে। দেশটিতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। বিপরীতে কমছে তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। এই জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের ফলে আগামী দিনগুলোতে জাপানে বিপুলসংখ্যক কর্মীর চাহিদা তৈরি হতে পারে। আর এই পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাপান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে কমছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৪০ সাল নাগাদ জাপানে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ কর্মক্ষম মানুষের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এই ঘাটতি পূরণে বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে জাপান।
জাপানের শ্রমবাজারে বিদেশিদের জন্য বর্তমানে স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার (SSW) কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন খাত উন্মুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে নির্মাণ, শিল্প উৎপাদন, প্রবীণ সেবা বা কেয়ারগিভিং, কৃষি, অটোমোবাইল, মোটরযান পরিবহন ও রেলওয়েসহ একাধিক খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশও এই সুযোগ কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অন্তত এক লাখ দক্ষ কর্মী জাপানে পাঠানো।
জাপানে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ায় কেয়ারগিভার বা প্রবীণ সেবাকর্মীর চাহিদাও বাড়ছে। এ পেশায় মূলত বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা, খাবার খাওয়ানো, চলাফেরায় সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার মতো কাজ করতে হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় কেয়ারগিভারদের মাসিক আয় প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে প্রকৃত আয় নিয়োগকর্তা, কর্মক্ষেত্র, অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করে।
এ খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে কয়েক বছর কাজ করার পর জাপানের জাতীয় লাইসেন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে দীর্ঘমেয়াদে জাপানে থাকার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপানে কাজের অন্যতম প্রধান প্রস্তুতি হলো জাপানি ভাষা শেখা। সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে যেতে প্রার্থীদের নির্দিষ্ট ভাষাগত যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। JFT-Basic বা JLPT N4-এর মতো পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এ ছাড়া টেকনিক্যাল ইন্টার্ন ট্রেনিং প্রোগ্রামের (টিআইটিপি) মাধ্যমেও জাপানে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ের প্রাথমিক ভাষা প্রশিক্ষণ নিয়ে কিছু কর্মসূচির আওতায় জাপানে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জাপানি ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগও বাড়ানো হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারে জাপানি ভাষা শেখানোর কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রবাসী কর্মীদের তথ্যভান্ডার তৈরিতে ‘আমি প্রবাসী’ অ্যাপের ডাটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে জাপানি ভাষা শেখার প্রতি তরুণদের আগ্রহও দেখা যাচ্ছে। খুলনা টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের একটি ইভিনিং ব্যাচে ৪০টি আসনের বিপরীতে প্রায় ৮০০ আবেদন জমা পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
রাজধানীর বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি বলে জানিয়েছেন কয়েকজন প্রশিক্ষক।
জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশকে নেপালের মতো দেশের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এরই মধ্যে গত এক থেকে দেড় বছরে নেপাল থেকে প্রায় ৬০ হাজার কর্মী জাপানে গেছেন।
নেপালের প্রস্তুতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, জাপানি ভাষার পাশাপাশি দেশটির সংস্কৃতি ও কর্মক্ষেত্রের শিষ্টাচার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া। জাপান থেকে শিক্ষক ও প্রশিক্ষক এনে ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর উদ্যোগও রয়েছে সেখানে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও শুধু ভাষা শিক্ষা নয়, জাপানি সংস্কৃতি, কর্মশৃঙ্খলা, শিষ্টাচার ও কর্মপরিবেশ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
জাপানের আধুনিক শিল্পকারখানায় রোবোটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে এখনো পুরোনো যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণ পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
ফলে জাপানের শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ কর্মী তৈরি করতে প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও কারিকুলাম আধুনিকায়নের প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে আধুনিক শিল্পপ্রযুক্তি, রোবোটিকস ও এআইভিত্তিক কাজের সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের পরিচিত করার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অর্থের অভাবে যেন আগ্রহী কর্মীরা পিছিয়ে না পড়েন, সে জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিনা জামানতে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ঋণের ব্যবস্থার কথাও উঠে এসেছে সরকারের বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
এ ছাড়া জাপানে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যাও বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান জাপানি প্রশিক্ষক দিয়ে ভাষা ও সংস্কৃতি শেখানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো, সরাসরি তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমানো গেলে জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়ানো সম্ভব।
সূত্র: জাপান টাইমস ও বাসস



