রাজধানীর বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট এখন বেশ পরিচিত সমস্যা। চুলা জ্বালাতে গিয়ে দেখা যায়, পাইপলাইনে গ্যাস নেই। আবার গ্যাস থাকলেও অনেক সময় পর্যাপ্ত চাপ থাকে না। অন্যদিকে এলপিজি ব্যবহারকারীদেরও সিলিন্ডার শেষ হওয়ার পর নতুন সিলিন্ডার কেনা এবং বাড়তি খরচের হিসাব নিয়ে ভাবতে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে রান্নাঘরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বৈদ্যুতিক চুলা। এর মধ্যে ইন্ডাকশন ও ইনফ্রারেড দুই ধরনের চুলার ব্যবহারই বাড়ছে। দেখতে অনেকটা একই রকম হলেও কাজের ধরন, রান্নার গতি, পাত্রের ব্যবহার, বিদ্যুৎ খরচ ও নিরাপত্তার দিক থেকে দুটির মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।
তাই নতুন বৈদ্যুতিক চুলা কেনার আগে প্রশ্ন আসে রান্নাঘরের জন্য কোনটি বেশি উপযোগী, ইন্ডাকশন নাকি ইনফ্রারেড?
ইন্ডাকশন চুলার অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সরাসরি হাঁড়ি বা প্যানের তলায় তাপ তৈরি করে। তড়িৎ-চৌম্বকীয় শক্তির মাধ্যমে পাত্রের তলদেশে তাপ উৎপন্ন হয়। ফলে চুলার ওপরের অংশ তুলনামূলক কম গরম থাকে।
এ কারণে ইন্ডাকশন দ্রুত গরম হয় এবং পানি তুলনামূলক দ্রুত ফুটে ওঠে। রান্নার সময় তাপ বাড়ানো বা কমানোও সহজ। আঁচ কমিয়ে দিলে দ্রুত রান্নার তাপমাত্রা কমে আসে।

প্রতিদিন রান্না করেন এমন ব্যক্তিদের জন্য এই তাপ নিয়ন্ত্রণ বেশ কার্যকর। বিশেষ করে ভাত, ডাল, তরকারি কিংবা স্যুপের মতো খাবারে নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ধরে রাখা সহজ হয়।
গ্যাসের চুলার মতো এতে চারপাশে আগুন জ্বলে না। ফলে রান্নাঘরের আশপাশে অতিরিক্ত তাপও তুলনামূলক কম ছড়ায়। ছোট রান্নাঘরে এটি বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
তবে ইন্ডাকশনের একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে সব ধরনের হাঁড়ি-পাতিল এতে ব্যবহার করা যায় না।
সাধারণত যেসব পাত্রের তলায় চুম্বক আকৃষ্ট হয়, সেগুলো ইন্ডাকশনে ব্যবহার করা যায়। সহজে পরীক্ষা করতে পাত্রের তলায় চুম্বক ধরতে পারেন। চুম্বক আটকে গেলে সাধারণত সেটি ইন্ডাকশনের উপযোগী।
ইনফ্রারেড চুলার কাজের ধরন ইন্ডাকশনের চেয়ে আলাদা। এতে চুলার কাচ বা সিরামিকের ওপরের অংশ গরম হয় এবং সেই তাপ পাত্রে পৌঁছে রান্না হয়।
এ কারণে প্রায় সব ধরনের রান্নার পাত্র এতে ব্যবহার করা যায়। অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, কাচ কিংবা সিরামিকের পাত্র সাধারণত এতে ব্যবহার করা সম্ভব।
বাংলাদেশি রান্নাঘরের জন্য এটি বড় সুবিধা। কারণ রান্নার ধরন অনুযায়ী একেক ধরনের হাঁড়ি-কড়াই ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। মাছ ভাজা, ডাল রান্না কিংবা দীর্ঘ সময় মাংস কষানোর মতো কাজে আলাদা আলাদা পাত্র ব্যবহার করেন অনেকেই।
ইনফ্রারেড চুলায় পুরোনো পাত্রগুলোই ব্যবহার করা যায়। ফলে নতুন করে রান্নাঘরের সব পাত্র বদলানোর প্রয়োজন হয় না।
এ কারণে গ্যাসের চুলা থেকে বৈদ্যুতিক চুলায় যেতে চান এমন ব্যবহারকারীদের কাছে ইনফ্রারেড কিছুটা পরিচিত মনে হতে পারে। রান্নার পদ্ধতিতেও বড় কোনো পরিবর্তন আনতে হয় না।
তবে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। রান্নার সময় কাচ বা সিরামিকের পৃষ্ঠ বেশ গরম হয়ে যায় এবং চুলা বন্ধ করার পরও কিছু সময় গরম থাকে। তাই বাসায় ছোট শিশু থাকলে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
রান্নার দক্ষতায় কে এগিয়ে?
ইনফ্রারেড চুলায় কাচের নিচে থাকা হ্যালোজেন বাতি বা কয়েলের মাধ্যমে তাপ তৈরি হয়। সেই তাপ কাচের পৃষ্ঠ হয়ে পাত্রে পৌঁছায়। তাপ তুলনামূলকভাবে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ায় ধীরে ধীরে বা দীর্ঘ সময় ধরে রান্নার ক্ষেত্রে এটি সুবিধাজনক।
অন্যদিকে ইন্ডাকশন চুলা তড়িৎ-চৌম্বকীয় শক্তির মাধ্যমে সরাসরি পাত্রের তলায় তাপ তৈরি করে। ফলে এটি দ্রুত গরম হয় এবং তাপমাত্রা আরও নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
অর্থাৎ দ্রুত রান্না ও তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ইন্ডাকশন এগিয়ে, আর পাত্রের বৈচিত্র্য ও সমান তাপের ক্ষেত্রে ইনফ্রারেড বেশি সুবিধাজনক।
বিদ্যুৎ খরচে কোনটি সাশ্রয়ী?
ইনফ্রারেড চুলা সাধারণ বৈদ্যুতিক কয়েল চুলার তুলনায় কার্যকর হলেও ইন্ডাকশনের তুলনায় কিছুটা বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে।
এর কারণ, ইনফ্রারেড চুলায় প্রথমে তাপ তৈরি হয় এবং পরে সেই তাপ পাত্রে পৌঁছায়। অন্যদিকে ইন্ডাকশন সরাসরি পাত্রের তলায় তাপ তৈরি করে। এতে শক্তির অপচয় তুলনামূলক কম হয় এবং রান্নাও দ্রুত সম্পন্ন হয়।
তাই বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের দিক থেকে ইন্ডাকশন সাধারণত এগিয়ে।
নিরাপত্তায় কোনটি ভালো?
ইনফ্রারেড চুলার কাচের পৃষ্ঠ রান্নার সময় বেশ গরম হয়ে যায়। চুলা বন্ধ করার পরও কিছু সময় তা গরম থাকতে পারে। ফলে অসাবধান হলে হাত পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ইন্ডাকশনে মূলত পাত্রের তলাতেই তাপ তৈরি হয়। ফলে চুলার পৃষ্ঠ তুলনামূলক কম গরম থাকে। অনেক ইন্ডাকশন চুলায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত গরম থেকে সুরক্ষা এবং শিশু-নিরাপত্তা তালার মতো সুবিধাও থাকে।
তাই নিরাপত্তার দিক থেকেও ইন্ডাকশন কিছুটা এগিয়ে।
দামের হিসাবে কোনটি লাভজনক?
ইনফ্রারেড চুলার দাম সাধারণত তুলনামূলক কম হতে পারে। এর সঙ্গে বাড়তি পাত্র কেনার প্রয়োজনও নেই। তাই কম বাজেটে বৈদ্যুতিক চুলা কিনতে চাইলে ইনফ্রারেড সুবিধাজনক।
অন্যদিকে ইন্ডাকশন চুলার দাম কিছুটা বেশি হতে পারে। পাশাপাশি ইন্ডাকশন-উপযোগী পাত্র কেনার প্রয়োজন হলে প্রাথমিক খরচ আরও বাড়বে।
তবে দ্রুত রান্না এবং তুলনামূলক কম বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে দীর্ঘমেয়াদে ইন্ডাকশন অর্থ সাশ্রয়ে সহায়ক হতে পারে।
কম খরচে শুরু করতে চাইলে ইনফ্রারেড, আর দীর্ঘমেয়াদি সাশ্রয় ও দক্ষতা চাইলে ইন্ডাকশন ভালো বিকল্প।
চুলা কেনার সময় শুধু দাম বিবেচনা করলেই হবে না। প্রতিদিন কতক্ষণ রান্না করবেন এবং বাসার বিদ্যুৎ সংযোগ কতটা শক্তিশালী, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
চুলার গায়ে উল্লেখ করা ক্ষমতার মাত্রা দেখে নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বাসার সকেট, বৈদ্যুতিক তার ও সার্কিট ব্রেকার প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক চাপ নিতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া ভালো।
বিশেষ করে উচ্চ ক্ষমতার বৈদ্যুতিক চুলা মাল্টিপ্লাগ বা নিম্নমানের বাড়তি সংযোগ বোর্ডে ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
গ্যাসের বিকল্প, নাকি বাড়তি সুবিধা?
ইন্ডাকশন বা ইনফ্রারেড চুলাকে এলপিজির পুরোপুরি বিকল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। অনেক পরিবারের জন্য দুটির সমন্বিত ব্যবহারই হতে পারে বাস্তবসম্মত সমাধান।
এলপিজিতে বড় রান্না করা যেতে পারে, আর বৈদ্যুতিক চুলায় প্রতিদিনের ছোটখাটো রান্না, পানি গরম করা কিংবা দ্রুত কিছু তৈরি করা যায়। আবার বিদ্যুৎ সরবরাহ ও রান্নার অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে কারও ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক চুলাই হয়ে উঠতে পারে রান্নার প্রধান মাধ্যম।
সব দিক বিবেচনায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়, দ্রুত রান্না, তাপ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তায় ইন্ডাকশন এগিয়ে। আর কম প্রাথমিক খরচ, পুরোনো পাত্র ব্যবহারের সুবিধা এবং পাত্রের বৈচিত্র্যের ক্ষেত্রে ইনফ্রারেড বেশি সুবিধাজনক।