মিয়ানমারে যেভাবে আবারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে জান্তা | চ্যানেল আই অনলাইন

মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে চলমান সংঘাতে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে ফিরেছে দেশটির সামরিক বাহিনী। একসময় বিদ্রোহীদের দখলে থাকা বেশ কয়েকটি কৌশলগত শহর পুনর্দখল করেছে তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাপক হারে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ, ভয়াবহ বিমান হামলা এবং চীনের ভূমিকা সামরিক বাহিনীর এই অগ্রযাত্রার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

গত এপ্রিলে ভারতের সীমান্তসংলগ্ন মিয়ানমারের চিন রাজ্যের ফালাম শহর ছেড়ে যায় বিদ্রোহীরা। তাদের দাবি, ছয় মাস ধরে সামরিক বাহিনীর হামলা প্রতিরোধের পর গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তারা শহরটি ছাড়তে বাধ্য হয়।

বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে প্রায় এক বছর থাকা ফালাম দখলে নিতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী শত শত বিমান হামলা চালায়। পাশাপাশি প্রায় ১ হাজার সেনা নিয়ে স্থল অভিযানও চালানো হয়।

ফালাম ছিল চিন রাজ্যের একমাত্র বিমানবন্দর থাকা শহর। একই সঙ্গে ভারতের সীমান্তের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকায় শহরটির কৌশলগত গুরুত্বও অনেক।

ফালাম দখলের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই চিন রাজ্যের আরও তিনটি শহর সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। মে মাসের শেষ নাগাদ রাজ্যটির পুরো উত্তরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে জান্তা।

বিদ্রোহী সংগঠন চিন ব্রাদারহুডের সদস্য সালাই উইলিয়াম চিন বলেন, ‘ফালাম আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। কোনো শহর দখল করা এবং সেটি ধরে রাখা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।’

তার মতে, দীর্ঘ সময় কোনো শহর ধরে রাখতে বিপুল জনবল, রসদ, প্রশাসনিক সক্ষমতা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং বিশেষ করে বারবার বিমান হামলা মোকাবিলার সক্ষমতা প্রয়োজন।

বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রায় ভাটা

মিয়ানমারজুড়ে সামরিক বাহিনীর এই অগ্রগতি বিদ্রোহীদের অবস্থানের বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা বিভিন্ন মিলিশিয়া ও জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনের জোট ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বেশ কিছু বড় সাফল্য পেয়েছিল।

সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে তারা সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে কয়েক ডজন শহর দখল করে নেয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই অগ্রযাত্রা থেমে গিয়ে দখলে নেওয়া শহরগুলো থেকে বিদ্রোহীদের ধীরে ধীরে পিছু হটার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে কাজ করছে। এগুলো হলো ব্যাপক হারে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর জনবল বৃদ্ধি, ভয়াবহ বিমান হামলা এবং চীনের সমর্থন।

পাঁচ বছরে গড়িয়েছে যুদ্ধ

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে এই সংঘাত শুরু হয়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের পর অনেক তরুণ অস্ত্র হাতে তুলে নেন। গড়ে ওঠে পিপলস ডিফেন্স ফোর্সেস বা পিডিএফ।

দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কয়েকটি তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এসব সংগঠনের কেউ কেউ ১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করে আসছে।

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটা বা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, প্রায় ৩৯ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং প্রতি তিনজনের একজনের মানবিক সহায়তা প্রয়োজন।

২২টি শহর পুনর্দখলের দাবি

অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং এ বছর নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের পর এপ্রিল মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। বড় বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি এবং দেশের অনেক এলাকায় ভোট দেওয়া সম্ভব হয়নি বা ভোট বর্জন করা হয়েছে।

মিন অং হ্লাইং এখন চিনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র বিরোধীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা করতে চান বলে জানিয়েছেন। তবে একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

মিয়ানমারের স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএসপি-মিয়ানমারের তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর সামরিক বাহিনী যে ১০১টি শহর হারিয়েছিল, তার মধ্যে এখন পর্যন্ত ২২টি পুনর্দখল করেছে। এগুলো হারানো এলাকার প্রায় ৯ শতাংশ হলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকার মধ্যে সীমান্ত অঞ্চল থেকে মধ্য মিয়ানমারের সামরিক ঘাঁটিগুলোর দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথও রয়েছে।

এসিএলইডির বিশ্লেষক সু মোনের মতে, এসব শহর পুনর্দখলের ফলে অনেক প্রতিরোধ গোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও রসদ সরবরাহের সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে। এর ফলে বড় আকারের সমন্বিত অভিযান থেকে সরে গিয়ে বিদ্রোহীরা প্রতিরক্ষামূলক গেরিলা যুদ্ধে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

তবে সামরিক বাহিনী বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘চূড়ান্ত বা রাজনৈতিকভাবে নির্ধারক জয়’ পাবে, এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, আগামী মাসগুলোতে মিয়ানমার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের মুখোমুখি হতে পারে।

দেড় লাখের বেশি নতুন সেনা

ব্যাংককভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অ্যান্থনি ডেভিসের মতে, বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ এবং চীনের সমর্থন সামরিক বাহিনীর ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তার হিসাবে, ২০২৪ সাল থেকে বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগের মাধ্যমে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর যুদ্ধক্ষম জনবলে প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার সদস্য যুক্ত হয়েছে। তাদের অনেকের প্রশিক্ষণ সীমিত হলেও সংখ্যার কারণে সামরিক বাহিনী ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে পারছে।

চীনের চাপের ফলে দুটি শক্তিশালী বিরোধী সংগঠন, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি এবং তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি, সংঘাত থেকে সরে গেছে। ফলে সামরিক বাহিনী অন্য এলাকায় সেনা পুনর্বিন্যাসের সুযোগ পেয়েছে।

এ ছাড়া চীন মিয়ানমারের অন্যতম শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন ইউনাইটেড ওয় স্টেট আর্মিকে বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে চাপ দিয়েছে। এর ফলে দেশজুড়ে বিদ্রোহীদের গোলাবারুদের সংকট আরও বেড়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

ডেভিস বলেন, যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন বিমান সক্ষমতা সামরিক বাহিনীকে বড় সুবিধা দিয়েছে। সেনাদের রসদ সরবরাহের পাশাপাশি বিদ্রোহীদের ওপর হামলাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে নজরদারি ও হামলার কাজে ড্রোনের দ্রুত বিস্তার এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে উন্নত সমন্বয় সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

বিমান হামলায় শত শত বেসামরিক নিহত

সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিও ব্যাপক হয়েছে।

মিয়ানমার ইন্টারনেট প্রজেক্টের হিসাবে, এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশটিতে ৫২০টি বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলা ৮৭টি টাউনশিপে আঘাত হানে এবং অন্তত ৩১৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৪১টি শিশু ছিল।

চিন রাজ্যে সবচেয়ে বেশি ১২২টি বিমান হামলা হয়েছে। এরপর সাগাইংয়ে ১০১টি এবং রাখাইনে ৯৮টি হামলা চালানো হয়।

এশিয়া হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার অ্যাডভোকেটসের পরিচালক ফিল রবার্টসনের মতে, সামরিক বাহিনীর বিমান শ্রেষ্ঠত্ব মোকাবিলা করতে না পারায় বিরোধীদের লড়াইয়ের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।

তিনি বলেন, বিমান হামলা পিডিএফ ও অন্যান্য প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ভেঙে দেয়। একই সঙ্গে বিদ্রোহীদের সমর্থন করা বেসামরিক মানুষদেরও ছত্রভঙ্গ করে দেয়।

লড়াই চালিয়ে যাব

তবে সামরিকবিরোধী গোষ্ঠীগুলো যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে বলে মানতে নারাজ।

নির্বাসনে থাকা অধিকারকর্মী থিনজার শুনলেই ই বলেন, বিরোধী নেটওয়ার্কগুলো এখনো সংগঠকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে এবং সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যেও প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়ার সাহস মিয়ানমারের মানুষের রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

চিনের বিদ্রোহী নেতা সালাই উইলিয়াম চিনও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে, তবে এ বিষয়ে এখনই প্রকাশ্যে কথা বলার সময় হয়নি। বিমান শক্তি যুদ্ধক্ষেত্রের ভাগ্য স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে বলেও তিনি মনে করেন না।

তার মতে, বিমান হামলা বড় চ্যালেঞ্জ হলেও যুদ্ধের ধরন ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রতিরোধ বাহিনীগুলোও নিজেদের কৌশল শিখছে ও মানিয়ে নিচ্ছে।

তিনি বলেন, বিরোধীদের সাফল্য শুধু প্রতিটি শহর স্থায়ীভাবে ধরে রাখার মাধ্যমে বিচার করা উচিত নয়। যেখানে সামরিক বাহিনীর বড় সুবিধা রয়েছে, বিশেষ করে বিমান শক্তির ক্ষেত্রে, সেখানে চলমান ও দ্রুত পরিবর্তনশীল যুদ্ধকৌশল বেশি কার্যকর হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেদের বাহিনীকে টিকিয়ে রাখা, বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখা।

Scroll to Top