আয় কমছে শ্রমিকের, সংসারে টানাটানি

গ্যাসের অভাবে কোথাও কারখানা বন্ধ, কোথাও উৎপাদন কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের আয়ে। নিয়মিত কাজ ও ওভারটাইম (অতিরিক্ত সময়ের কাজ) কমে যাওয়ায় অনেক শ্রমিকের মাসিক আয় কমে যাচ্ছে। চুক্তিতে কাজ করা শ্রমিকেরা পড়েছেন আরও বেশি সংকটে। কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় তাঁরা আগের মতো মজুরি পাচ্ছেন না।

গতকাল শনিবার নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল ঘুরে শ্রমিক, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

নরসিংদীতে গ্যাসনির্ভর তিন শতাধিক শিল্পকারখানা রয়েছে। গতকাল শনিবার দুপুরে শহরের শিল্পাঞ্চলখ্যাত চৌয়ালা ঘুরে অন্তত ১৫ জন শ্রমিক-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেছেন প্রথম আলোর নরসিংদী প্রতিনিধি। শ্রমিকেরা জানান, আধা কিলোমিটার এলাকার মধ্যে অন্তত ৩০টি সাইজিং ও ডাইং কারখানা আছে। এসব কারখানায় সুতা প্রক্রিয়াজাতকরণসহ উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন হয়। সেখানে কমপক্ষে ১০ হাজার শ্রমিক-কর্মচারী কাজ করেন।

গ্যাস না পাওয়ায় ইতিমধ্যে ২৫টি কারখানায় শ্রমিকদের ছুটি দেওয়া হয়েছে। এসব কারখানার একটি মোমিন সাইজিং মিল। গ্যাস-সংকটের জন্য কারখানাটি সাত দিন ধরে বন্ধ ছিল। কারখানার শ্রমিক আবদুস সালাম জানান, সাত দিন ছুটি শেষে কাজে ফিরে তিনি শোনেন আরও তিন দিনের ছুটি। গত মাসের বেতন এখনো পাননি। তিনি বলেন, ‘বউ-বাচ্চাদের নিয়ে খাব কী, চলব কেমনে, কিছুই বুঝতেছি না। আগামীকাল (রোববার) গ্রামের বাড়ি চলে যাব।’

রাব্বি সাইজিং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইলিয়াস মিয়া জানান, স্পিনিং, সাইজিং, টেক্সটাইল, ডাইং ও ক্যালেন্ডারিং কারখানা একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পৃক্ত। একটি বন্ধ থাকলে এর প্রভাব অন্যটিতে পড়ে। গ্যাস-সংকটে বর্তমানে স্পিনিং, সাইজিং, ডাইং কারখানা উৎপাদনশূন্য হয়ে যাওয়ায় টেক্সটাইল কারখানাও বিপাকে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিন পর টেক্সটাইল কারখানাও বন্ধ হয়ে যাবে।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশেদুল হাসান বলেন, ছুটি দেওয়া কারখানায় যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। শ্রমিকদের ফিরে পাওয়া যাবে কি না—এ নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে। সরকারের উচিত নরসিংদীর ব্যবসায়ীদের প্রতি সদয় হওয়া।

কমেছে ওভারটাইম

নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীর এএমএস গার্মেন্টসে মেশিন অপারেটর লিটন আহমেদ গত মাসে ৩০ ঘণ্টা ওভারটাইম করেছিলেন। গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটে চলতি মাসে এক ঘণ্টাও ওভারটাইম করতে পারেননি। লিটন আহমেদ বলেন, বাড়তি আয় না হলে পরিবার নিয়ে চলা কষ্টকর হয়ে পড়বে।

একই শিল্পনগরীর অলস্টার গার্মেন্টসে হেলপার নিরব মিয়া। গত মাসে তাঁর ১৮ ঘণ্টা ওভারটাইম হয়েছিল। চলতি মাসে কোনো ওভারটাইম নেই। বিকেলেই কারখানা ছুটি হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

তামাই নিট গার্মেন্টসের লকম্যান রাশেদুল হাসান গত মাসে ওভারটাইমসহ প্রায় ২২ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। চলতি মাসে ওভারটাইম না থাকায় তাঁর আয় ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকায় নেমে আসবে বলে জানান তিনি।

রাশেদুল হাসান বলেন, ওভারটাইমের আয় না থাকায় সংসার চালিয়ে নেওয়া কঠিন হবে। বাড়িতেও টাকা পাঠানো যাবে না।

পঞ্চবটী বিসিক শিল্পনগরীর ফোর ডিজাইন প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান বলেন, ডাইং কারখানা থেকে কাপড় না পাওয়ায় তাঁদের উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছে।

ফোর ডিজাইনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ শ্রমিক কাজ করেন। ফোর ডিজাইন প্রাইভেট লিমিটেডের প্রায় ২৫ শতাংশ শ্রমিক উৎপাদনভিত্তিক মজুরিতে কাজ করেন। উৎপাদন কমে যাওয়ায় তাঁদের কাজের সুযোগও যেমন কমেছে, আয়ও কমেছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি এম এ শাহীন প্রথম আলোকে বলেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় শ্রমিকেরা আট ঘণ্টার বেশি কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। ফলে ওভারটাইমও হচ্ছে না। বিশেষ করে চুক্তিতে কাজ করা শ্রমিকদের আয় কমে গেছে।

চাকরি হারানোর শঙ্কা

গাজীপুরের মৌচাক এলাকার সাদমা ফ্যাশনি লিমিটেড কারখানার পরিচালক সোহেল রানা বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে কারখানার ডাইং সেকশন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার গ্যাসের চাপ কিছু বাড়লেই কাজ করা হয়। এই সময়ে শ্রমিকদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।

গাজীপুরের ভোগড়া এলাকার বাসিন্দা আতাউর রহমান প্যানাসিয়া ক্লোদিং লিমিটেডের শ্রমিক। স্ত্রী রোকেয়া আক্তার ও পাঁচ বছরের সন্তানকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি। সংসারের বাড়তি খরচ সামলাতে আগে নিয়মিত ওভারটাইম করলেও গ্যাস-সংকটের কারণে এখন সেই সুযোগ কমে গেছে।

গতকাল দুপুরে মহানগরের ভোগড়া বাইপাস এলাকায় আতাউর রহমানের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আগে নিয়মিত ওভারটাইম করতাম। কাজ আরও কমে গেলে চাকরি থাকবে কি না, সেটাও চিন্তার বিষয়।’

কোনাবাড়ী বিসিকের পাশে পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন অনন্ত লিমিটেডের শ্রমিক রুমানা আক্তার। তিনি বলেন, ‘স্বামী অটোরিকশা চালান। পরিবারে শ্বশুর-শাশুড়িসহ ছয়জন মানুষ। সংসার চালাতে আমার আয়ের ওপরই অনেকটা নির্ভর করতে হয়। আগে ওভারটাইমের জন্য কিছু বাড়তি টাকা পেতাম। এখন কাজ কমেছে।’

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, গ্যাস-সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কারখানার উৎপাদন আরও কমতে পারে। এতে একদিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, অন্যদিকে শ্রমিকদের আয় ও কর্মসংস্থানেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই সরকারের উচিত এই পোশাকশিল্পকে ধরে রাখতে গ্যাসের সংকট দ্রুত নিরসন করা।

[প্রতিবেদনগুলো পাঠিয়েছেন প্রতিনিধি, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর]

Scroll to Top