বাংলাদেশের জনগণের জন্য অনেকগুলো ‘গালভরা’ ‘সান্ত্বনামূলক’ শব্দ রয়েছে সংবিধানে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫৩টি অনুচ্ছেদ রয়েছে, তার মধ্যে ‘অনুচ্ছেদ ৭(১) অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ।
অর্থাৎ রাষ্ট্রের যা কিছু ভালো-মন্দ দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের কিংবা সরকারের নয়। সে দায়িত্ব পালন করবে রাষ্ট্রের মূল মালিক জনগণ। গাড়ি বা বিমানের নিরাপত্তা দেখার দায়িত্ব যেমনিভাবে মালিকের। সাময়িকভাবে চালকের আসনে উপবিষ্ট চালক বা পাইলটের নয়। এসব কথা যুক্তিতর্কে খাটলেও বাস্তবিক অর্থে জনগণ এই ক্ষমতার কতটুকু প্রয়োগ বা সুবিধা ভোগ করতে পারে সে প্রশ্ন রয়েই যায়। জনগণও এতসব প্রত্যাশা করে বলে মনে হয় না। তারা পাঁচ বছরে একবার নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার এবং ন্যূনতম মৌলিক সুবিধা পেলেই খুশি। কখনো সখনো মৌলিক অধিকারেও ছাড় দিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে তারা। অনেকে হয়তো প্রাপ্য অধিকারটুকু সম্পর্কে জানেই না।
সংবিধানের তৃতীয় ভাগে জনগণকে কিছু মৌলিক অধিকার দেয়া হয়েছে, যা ৪৪ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে আদালত কর্তৃক বলবৎযোগ্য। এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। সংবিধানের মৌলিক কাঠামো জনগণের সার্বভৌমত্ব ও ক্ষমতায়নের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। মূলত মৌলিক অধিকারগুলোই গণশক্তি বা ক্ষমতার ভিত্তি। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানে কতগুলো মানবাধিকারকে এ দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সোভিয়েত সমর্থক দেশ হলেও বাংলাদেশ মূলত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারগুলোকে সংবিধানের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত দিয়েছিল কিন্তু অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারকে রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেনি বরং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃত যেকোনো অধিকারের যথাযথ বাস্তবায়ন না হলে নাগরিকরা উচ্চ আদালতে প্রতিকার চাইতে পারে যা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। অর্থাৎ এ মূলনীতিগুলো নাগরিককে সঠিকভাবে দিতে না পারলে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আদালতে গিয়ে কোনো ধরনের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকে না।
এরপরও মৌলিক অধিকার এবং জনঅধিকার নিয়ে রাষ্ট্র, সরকার এবং রাজনীতিক গোষ্ঠীদের নানা প্রতিশ্রুতি, বক্তব্য উদ্যোগের প্রচারে আমরা খুশি হই। আবার সেই অধিকারের প্রতিটি স্তর যখন বেসরকারিকরণ হয় তখন নাগরিকের চিন্তিত হবারই কথা। আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো একে একে সবই বেসরকারি পদ্ধতিতে ঢুকে যাচ্ছে। আরেকটু স্পষ্ট বললে ঢোকানো হচ্ছে। খুব সূক্ষ্মভাবে। কৌশলে। সবশেষ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও সেই কৌশলের শিকার হচ্ছে কিনা; প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবছর মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রশ্নটি তীব্র হয়েছে। অনেকে এটিকে ফল বিপর্যয় বললেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে কারণে নিন্মগামী মনে হচ্ছে।
গেল বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বলা হয়েছিল- ‘অতীতের মতো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখার প্রবণতার চেয়ে সত্যিকার মূল্যায়ন হয়েছে।’ প্রশ্ন থাকে- সত্যিকার মূল্যায়নে যদি এত শিক্ষার্থী ফেল করে থাকে, তবে সমস্যা আসলে কোথায়? মাধ্যমিকের চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসার পূর্বে একজন শিক্ষার্থীকে অনেকগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং পদ্ধতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়। টেস্ট-প্রিটেস্টে উত্তীর্ণ হয়েই পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে একজন শিক্ষার্থী। যারা এসব জায়গায় সফল হয়ে কেন্দ্রীয় আয়োজনে গিয়েছিল তাদের থেকেই ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাশ করতে পারেনি। অর্থাৎ প্রতি তিনজনের একজনেরও বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য। এর বাইরে টেস্ট, প্রি-টেস্টে ঝাড়ে যাওয়া সংখ্যা তো রয়েছেই। সে হিসেব করলে ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষা নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য। এটি অবশ্যই চিন্তিত হবার কারণ। সংবিধান অনুযায়ী শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। যদি তাই হয়- এর দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। জাতিসংঘের একটা গবেষণায় দেখা গিয়েছিল- বাংলাদেশের শতভাগ শিশু স্কুলে যায়। কিন্তু প্রাথমিক শেষ হওয়ার আগেই ২৫ শতাংশ ঝরে পড়ে। এর ওপর এবার মাধ্যমিকে এমন বিপর্যয় সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত।
প্রথম তিন মৌলিক অধিকার- খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ক্ষেত্রে অধিকাংশ জনগণ নিজ ব্যবস্থাপনায়ই করে থাকে। সেক্ষেত্রে সরকার বা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার খুব প্রয়োজন পড়ে না। সঠিক শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনাতেই জনগণ খুশি থাকে। এরপর আমাদের মতো অনুন্নত দেশে চিকিৎসা এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের সরাসরি দায় রয়ে যায়। সরকারি চিকিৎসালয়ের নানা দুর্ভোগ এবং বেসরকারি চিকিৎসা ব্যবসার প্রসার দিন দিন বাড়ছে। একান্ত বাধ্য না হয়ে সরকারি চিকিৎসা গ্রহণে অনাগ্রহ এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। বাকি রইল শিক্ষা ব্যবস্থা। এক্ষেত্রে এখনো সাধারণ জনগণ আস্থা খোঁজার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি বেশ কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি আধিপত্য লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠছে। অন্যান্য সেক্টরেও আমরা দেখেছি কিভাবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রসারের জন্য সরকারি ব্যবস্থা সঙ্কুচিত করা হয়। এখনো সরকারি হাসপাতালে আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেও ভোগান্তি এমনভাবে তৈরি করা হয় যেন বাধ্য হয়ে বেসরকারিতে যেতে হয় রোগীকে। বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালের পাশেই অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আধিপত্য উল্লেখযোগ্য। শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছুদিন আগেও কোচিং বাণিজ্য এবং শিক্ষকদের প্রাইভেট সিন্ডিকেট ছিল বড় সমস্যা। এখন সেগুলো ছাপিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য চেপে বসেছে দিনকে দিন।
সরকারি, আধা সরকারি এবং এমপিও ভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পরিষদে রাজনীতিকীকরণ শুরু হয়েছে বহু আগেই। শিক্ষা এবং নৈতিকতার মানদণ্ড ছাপিয়ে কেবলমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বনে যাওয়া ব্যক্তি যখন নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ‘উপঢৌকন’, ‘অর্থ লেনদেন’ বা অন্যান্য ‘সুবিধা নিয়ে’ শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে থাকেন তখন শিক্ষার মান পশ্চদপদ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। এসব দিক বিবেচনায় রেখেই সরকারের নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করি।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)


