বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনে সক্ষম ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ফসল হিসেবে তুলা চাষ সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ, কার্যকর নীতি এবং কৃষকদের জন্য আরও বেশি প্রণোদনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের বস্ত্রশিল্পে ব্যবহৃত তুলার প্রায় ৯৭ শতাংশই আমদানি করতে হয়। এতে প্রতিবছর ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে অনুষ্ঠিত ‘তুলাবিষয়ক জাতীয় সংলাপ: জলবায়ু-অভিযোজিত ফসল হিসেবে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা’ শীর্ষক সংলাপে এসব বিষয় উঠে আসে। ব্র্যাকের ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন কর্মসূচি (সিইআইপি) এ সংলাপের আয়োজন করে।
সংলাপে দেশে তুলা উৎপাদনের পথে বিদ্যমান কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ, নীতিগত সহায়তা, গবেষণা, অর্থায়ন, কৃষি সম্প্রসারণসেবা, বাজার উন্নয়ন এবং ফসল সংগ্রহ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অনুষ্ঠানে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক (রুটিন দায়িত্ব) মো. রেজাউল আমিন বলেন, তুলা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক একটি ফসল। এর মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে তুলা চাষে কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে।
ব্র্যাকের ক্লাইমেট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন কর্মসূচি এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে তুলা হতে পারে একটি কার্যকর বিকল্প ফসল। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ সমন্বিত হলে দেশে তুলা উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
কটনকানেক্ট সাউথ এশিয়া প্রাইভেট লিমিটেডের জ্যেষ্ঠ কৃষিতত্ত্ব উপদেষ্টা এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. মো. ফরিদ উদ্দিন জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ২ লাখ বেল তুলা উৎপাদিত হয়, যা জাতীয় চাহিদার মাত্র ২ শতাংশ পূরণ করে। তিনি বলেন, তুলা একটি কার্বন-পজিটিভ ফসল এবং এক বছর আগে সরকার এটিকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে।
সংলাপে রাঙামাটির মানিকছড়ির তুলাচাষি মিতালী চাকমা জানান, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া বীজ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি গত তিন বছর ধরে সফলভাবে তুলা চাষ করছেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে তুলা চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
আলোচকেরা বলেন, তুলা উৎপাদনের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে জমির ব্যবহার নিয়ে ধান, তামাক ও উচ্চমূল্যের শীতকালীন সবজির সঙ্গে প্রতিযোগিতা, হাতে তুলা সংগ্রহের শ্রমনির্ভরতা, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, কৃষি উপকরণ, সম্প্রসারণসেবা, সংরক্ষণ, জিনিং সুবিধা এবং নিশ্চিত বাজারের অভাব।
তারা বরেন্দ্র অঞ্চল, উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকা, চরাঞ্চল ও পার্বত্য চট্টগ্রামসহ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তুলা চাষ সম্প্রসারণের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তাদের মতে, তুলা একটি তাপ ও খরা সহনশীল ফসল এবং ধানের তুলনায় কম পানি প্রয়োজন হওয়ায় উপযুক্ত এলাকায় এটি কৃষকদের জন্য লাভজনক ও টেকসই বিকল্প হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচিত অঞ্চলে তামাকের পরিবর্তে তুলা চাষ পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সংলাপে সূচনা বক্তব্য দেন সিইআইপি-এর কর্মসূচি প্রধান আবু সাদাত মনিরুজ্জামান খান। এছাড়া কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. আবেদ চৌধুরী, তুলা উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক মো. কুতুব উদ্দীন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল হাসানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।



