ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা কূটনীতি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করতে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ। এ উপলক্ষে মালেতে অবস্থিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে মালদ্বীপে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম মালদ্বীপের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় সেবা বিষয়ক মন্ত্রী হাসান রশীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা এবং ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্বের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করা হয়। উভয় পক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান অগ্রগতির প্রশংসা করে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বৈঠকের শুরুতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ২০০৪ সালের ভারত মহাসাগরীয় সুনামির পর মালদ্বীপের সংকটময় সময়ে বাংলাদেশের মানবিক সহায়তার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে তিনি বলেন, সে সময় বাংলাদেশের সহযোগিতা দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে।
তিনি মালদ্বীপকে সামরিক যানবাহন উপহারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অব্যাহত সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার আশা ব্যক্ত করেন।
আলোচনায় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উদীয়মান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ উভয়ই সামুদ্রিক রাষ্ট্র এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মুখোমুখি। তাই আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দুই দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা প্রয়োজন।
বৈঠকে সামরিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ সহযোগিতার বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। হাইকমিশনার উল্লেখ করেন, মালদ্বীপ ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্স (এমএনডিএফ)-এর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মকর্তা বাংলাদেশের বিভিন্ন সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। এসব কর্মকর্তা পরবর্তীকালে মালদ্বীপের প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মালদ্বীপীয় কর্মকর্তারা দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে পেশাগত সম্পর্ক, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। সামরিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিনিময়কে তিনি প্রতিরক্ষা কূটনীতির অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেন।
উভয় পক্ষ মালদ্বীপের সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য বাংলাদেশে পেশাগত কোর্স, স্টাফ প্রশিক্ষণ, বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উচ্চতর সামরিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ আরও সম্প্রসারণে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক মান ও পেশাগত সুনামের প্রশংসা করেন।
বৈঠকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, সামরিক লজিস্টিকস এবং কারিগরি সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনাও আলোচনা করা হয়। হাইকমিশনার বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতার কথা তুলে ধরে এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধানের আগ্রহ প্রকাশ করেন।
এ ছাড়া মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রমে সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশগত ঝুঁকির মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ আঞ্চলিক স্থিতিস্থাপকতা ও মানবিক নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মত দেন উভয় পক্ষ।
বৈঠকের শেষে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে তার সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে বিদ্যমান সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বৈঠক শেষে উভয় পক্ষ বাংলাদেশ–মালদ্বীপ প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি সামরিক সহযোগিতা, পেশাগত বিনিময় এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ হাইকমিশন জানায়, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ–মালদ্বীপের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে তারা কাজ অব্যাহত রাখবে।


