লাল গ্রহ মঙ্গলের সুদূর অতীত সম্পর্কে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার পারসিভারেন্স রোভার। রোভারটি মঙ্গলের জেজেরো খাদের কিনারায় প্রায় ২৪৫ ফুট পুরু একটি বিশাল শিলাস্তরের সন্ধান পেয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বারবার সংঘটিত শক্তিশালী গ্রহাণুর আঘাতের ফলেই এই শিলাস্তর গঠিত হয়েছে।
গবেষকরা এই শিলাস্তরের নাম দিয়েছেন ‘ব্রুম পয়েন্ট মেম্বার’। এর বয়স প্রায় ৩৯০ কোটি বছর বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি এখন পর্যন্ত মঙ্গলে আবিষ্কৃত এবং পরীক্ষা করা সবচেয়ে প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক স্তরগুলোর অন্যতম। ফলে মঙ্গলের আদিম ইতিহাস সম্পর্কে নতুনভাবে জানার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি জার্নাল অব জিওফিজিক্যাল রিসার্চ: প্ল্যানেটস-এ প্রকাশিত গবেষণায় সৌরজগতের ইতিহাসের সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ সময়ের নানা তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, সেই সময়ে ঘন ঘন গ্রহাণুর আঘাতে মঙ্গলের ভূ-পৃষ্ঠে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছিল।
পারসিভারেন্স প্রকল্পের বিজ্ঞানী কেন ফার্লে জানান, পৃথিবীর প্রাচীন ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসের অধিকাংশই টেকটোনিক প্লেটের ক্রমাগত চলাচলের কারণে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু মঙ্গলে টেকটোনিক প্লেট না থাকায় কোটি কোটি বছর আগের ভূতাত্ত্বিক রেকর্ড আজও প্রায় অক্ষত রয়েছে। ফলে পৃথিবীতে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মঙ্গলের বুকে সংরক্ষিত রয়েছে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে পারসিভারেন্স রোভার এই এলাকায় অনুসন্ধান শুরু করে। গবেষণার সময় বিজ্ঞানীরা সেখানে অন্তত ছয় ধরনের শিলার উপস্থিতি শনাক্ত করেন, যা মঙ্গলের গঠন ও বিবর্তন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিলাগুলোর মধ্যে কাচের মতো দেখতে অসংখ্য ক্ষুদ্র গোলাকার কণা বা গুটিকা রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রবল শক্তির গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্টি হওয়া অতিরিক্ত তাপ ও চাপের ফলেই এসব কণার জন্ম হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, এসব গুটিকার কয়েকটি আকারে পৃথিবীতে ডাইনোসরের বিলুপ্তির জন্য দায়ী চিকসুলুব গ্রহাণুর আঘাতে সৃষ্টি হওয়া গুটিকার সঙ্গে মিল রয়েছে।
গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক অ্যালেক্স জোনস জানান, দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন আকারের গ্রহাণুর ধারাবাহিক আঘাতের ফলেই এই বিশাল শিলাস্তর তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, পানি বা বরফও এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। পৃথিবীতে যেমন গলিত শিলা পানি বা বরফের সংস্পর্শে এসে দ্রুতগতির প্রবাহ সৃষ্টি করে, তেমনি মঙ্গলেও একই ধরনের প্রক্রিয়ায় এই স্তরগুলোর সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু মঙ্গলের অতীত ইতিহাসই নয়, বরং সৌরজগতের প্রাথমিক গঠন, গ্রহাণুর সংঘর্ষ এবং গ্রহের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে। ভবিষ্যতে পারসিভারেন্স রোভারের আরও অনুসন্ধান মঙ্গলের অজানা ইতিহাসের বহু রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
