চরকির পাঁচ বছর: সবসময় ছিল নতুন কিছু করার ইচ্ছা | চ্যানেল আই অনলাইন

চরকির পাঁচ বছর: সবসময় ছিল নতুন কিছু করার ইচ্ছা | চ্যানেল আই অনলাইন

চরকির সঙ্গে আমার পরিচয়টা বেশ পুরোনো। এখনো মনে আছে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে আমরা নিয়মিত প্রথম আলোর একটা কনফারেন্স রুমে বসতাম। শতাব্দীর মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক মহামারীর পর আমরা তখন সবাই নতুন করে ভাবছি—দর্শক কী দেখতে চায়, আর আমরা কী ধরনের গল্প বলতে চাই। পুরো বিনোদন জগতটাই যেন এক অদ্ভুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সিনেমা হলের বাইরে এসে ওটিটি তখন নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কীভাবে কাজে লাগানো হবে, সেটার উত্তর তখনও কেউ পুরোপুরি জানত না। ঠিক সেই সময়েই রবি ভাইয়ের ‘ঊনলৌকিক’ অ্যান্থলজি সিরিজের মাধ্যমে চরকির সঙ্গে আমার সরাসরি কাজ শুরু হয়। সেই কাজের মধ্য দিয়েই বুঝতে শুরু করি, চরকির গল্প ভাবার ধরনটা অন্যরকম।

এরপর ‘জাগো বাহে’ নিয়ে যখন কাজ শুরু হলো, তখন সত্যি বলতে একটু অবাকই হয়েছিলাম। ততদিনে বিশ্বের বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলির ওটিটি প্লাটফর্মগুলি সফল হবার নির্দিষ্ট ছকে বাঁধা ফর্মুলা আবিষ্কার করে ফেলেছে। আর বাংলাদেশের ওটিটির জন্য কাজ করতে গিয়ে একটা ধারণা তৈরি হয়ে গেছে—কোন ধরনের গল্পে সবাই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, আর কোন ধরনের গল্পকে একটু বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়। ‘জাগো বাহে’ ছিল ঠিক সেই দ্বিতীয় ধরনের একটি প্রজেক্ট।

ইতিহাস-আশ্রিত গল্প হলেও এটি প্রচলিত নায়ককেন্দ্রিক কাঠামো অনুসরণ করে না। এর চরিত্রগুলো সহজ উত্তর দেয় না, গল্পও দর্শককে ধরে ধরে পথ দেখায় না। নির্মাণভঙ্গি বাঁ সিনেমাটিক ল্যাংগুয়েজ যাই বলি —সবকিছু মিলিয়ে এটি ছিল বেশ অপ্রচলিত একটি কাজ। আমার মনে হয়, তখন বাংলাদেশের খুব কম প্ল্যাটফর্মই এমন একটি প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতে রাজি হতো। কারণ এমন কাজের সাফল্য আগে থেকে হিসাব করা যায় না। চরকি সেই হিসাবের বাইরে গিয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

এই জায়গাটাই চরকির সবচেয়ে বড় শক্তি বলে আমার মনে হয়। গত পাঁচ বছরে তাদের সঙ্গে আমি নানা ভূমিকায় কাজ করেছি—প্রযোজক, পরিচালক, সম্পাদক। প্রতিটি ভূমিকায় দাঁড়িয়ে চরকিকে ভিন্নভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে। সব কাজ যে সমান ভালো হয়েছে, তা নয়। সব সিদ্ধান্তও যে ঠিক ছিল, সেটাও নয়। কোনো কোনো কাজ পরিকল্পনার মতো এগিয়েছে, আবার কোনো কোনো কাজ আমাদের প্রত্যাশামতো ফল দেয়নি। কিন্তু একটা বিষয় সবসময়ই চোখে পড়েছে—চরকি কখনই বাজারধন্য হওয়ার কথা চিন্তা করতে গিয়ে শিল্পের সাথে আপস করেনি।

বরং তারা এমন গল্পের প্রতিই আগ্রহী হয়েছে, যেগুলো নিয়ে প্রথমেই প্রশ্ন ওঠে, “এটা কি সত্যিই কাজ করবে?” মজার ব্যাপার হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় আগে থেকে কারও জানা থাকে না। শিল্পের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যও সম্ভবত এখানেই। কোনো ফর্মুলা দিয়ে সব গল্পের সাফল্য মাপা যায় না। নতুন কিছু করতে চাইলে অনিশ্চয়তাকে মেনে নিতেই হয়।

আমার মনে হয়, এই অনিশ্চয়তাকে গ্রহণ করার সাহসটাই চরকিকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। কারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করলে নতুন ভাষা তৈরি হয় না, নতুন গল্পও জন্ম নেয় না। তখন আমরা শুধু একই ধরনের গল্পই একটু ভিন্ন মোড়কে বারবার বলতে থাকি। দর্শকের রুচিও তাতে খুব বেশি এগোয় না, নির্মাতার কল্পনাশক্তিও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

এই পাঁচ বছরে চরকির সঙ্গে আমার প্রতিটি কাজের অভিজ্ঞতা আলাদা। কোনোটা খুব সহজ ছিল, কোনোটা কঠিন, আবার কোনোটা শেষ হয়েছে ডেডলাইনের একেবারে শেষ রাতে। কোথাও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে, কোথাও মতের অমিল হয়েছে, কোথাও আবার শেষ মুহূর্তে নতুন সমাধান খুঁজতে হয়েছে। তখন হয়তো এসব মুহূর্ত খুব চাপের মনে হয়েছে। কিন্তু এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, এগুলো শুধু প্রজেক্ট ছিল না; শেখারও একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছিল। একজন নির্মাতা হিসেবে যেমন শিখেছি, তেমনি একজন সহকর্মী হিসেবেও অনেক কিছু শিখেছি।

পাঁচ বছর খুব বড় সময় নয়। কিন্তু এই অল্প সময়েই চরকি এমন অনেক গল্প বলেছে, যেগুলো হয়তো অন্য কেউ বলত না, কিংবা বলার সাহস করত না। সব গল্প সমানভাবে সফল হয়েছে কি না, সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু নতুন কিছু করার ইচ্ছাটা কখনোই অনুপস্থিত ছিল না। আমার কাছে সেই চেষ্টাটাই সবচেয়ে মূল্যবান।

সেই যাত্রার ছোট্ট একটা অংশ হতে পেরেছি—এটাই আমার কাছে বড় প্রাপ্তি। আশা করি আগামী পাঁচ বছরেও চরকি এমন গল্প নিয়েই ব্যস্ত থাকবে, যেগুলো শুনে প্রথমে একটু অস্বস্তি, একটু সংশয়, কিংবা একটু ভয় লাগে। কারণ অভিজ্ঞতা থেকে আমি অন্তত এটুকু বুঝেছি—সবচেয়ে স্মরণীয় গল্পগুলো অনেক সময় শুরুই হয় সেই অচেনা, অনিশ্চিত জায়গা থেকে।

 

সালেহ সোবহান অনীম
পরিচালক, প্রযোজক এবং সম্পাদক

Scroll to Top