আস্থা আমাদের ডিজিটাল সমাজের অদৃশ্য অবকাঠামো। দুই দশকেরও বেশি আগে ডব্লিউএসআইএস এর সি১ থেকে সি১১ অ্যাকশন লাইনের মধ্যে সি৫ তথ্যসমাজের কেন্দ্রে আস্থা ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি তুলে ধরেছিল।
আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কৃত্রিম কণ্ঠ, বিকৃত ছবি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল হুমকি সেই কাজকে আরও জরুরি করে তুলেছে। কিন্তু আমি একটি সহজ প্রশ্ন করতে চাই: আমরা কি এমনভাবে ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরি করছি, যেখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে যে মানুষ ভুল করবেই?
কল্পনা করুন, আমরা অনেক আধুনিক ডিজিটাল মহাসড়ক তৈরি করেছি। দ্রুতগতির যান। নতুন প্রযুক্তি। কোটি কোটি ব্যবহারকারী। কিন্তু কার্যকর সিগন্যাল নেই। গতিনিয়ন্ত্রণ দুর্বল। নিরাপত্তামান যথেষ্ট নয়। জরুরি সাড়ার ব্যবস্থাও নেই তারপর একটি দুর্ঘটনা ঘটল। আর ডিজিটাল সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষটিকে আমরা প্রথমেই জিজ্ঞেস করলাম: “আপনি আরও সতর্ক হলেন না কেন?”
ডিজিটাল পৃথিবীতে আমরা প্রায় প্রতিদিনই এমন করি। কারও টাকা হারিয়েছে। “লিংকে ক্লিক করলেন কেন?” একজন প্রবীণ মানুষ এআই দিয়ে তৈরি পরিচিত কণ্ঠ বিশ্বাস করেছেন। “যাচাই করলেন না কেন?” একজন নারীর ছবি AI ব্যবহার করে বিকৃত করা হয়েছে। “ছবিটি অনলাইনে পোস্ট করেছিলেন কেন?” হ্যাঁ, ব্যবহারকারীরও দায়িত্ব আছে।
কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতাকে অনিরাপদ ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। আজ আমি একটি ‘ডিজিটাল সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ প্রস্তাব করছি। এটি সড়ক নিরাপত্তার ‘সেফ সিস্টেম’ দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত একটি ভবিষ্যতমুখী নীতিগত প্রস্তাব। আমি পাঁচটি পরস্পরসংযুক্ত স্তম্ভের কথা বলছি।
প্রথম স্তম্ভ: নিরাপদ ডিজিটাল মানুষ
আমাদের প্রয়োজন জীবনব্যাপী সাইবার সাক্ষরতা, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা এবং স্থানীয় ভাষায় ব্যবহারিক ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা।
দ্বিতীয় স্তম্ভ: নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো
নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ডিজিটাল পরিচয় ও ডেটা ব্যবস্থা হতে হবে নিরাপদ, সহনশীল এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
তৃতীয় স্তম্ভ: নিরাপদ ডিজিটাল প্রযুক্তি
AI, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ডিভাইস ও আর্থিক সেবাকে অস্বাভাবিক আচরণ শনাক্ত করতে হবে। নিরাপত্তা কোনো ঐচ্ছিক সেটিং নয়। নিরাপত্তা হতে হবে ডিফল্ট।
চতুর্থ স্তম্ভ: নিরাপদ ডিজিটাল গতি
AI যুগে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ক্ষতি লাখো মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়তে পারে, সেখানে আমাদের প্রয়োজন ইন্টেলিজেন্ট ফ্রিকশন বা বুদ্ধিমান নিয়ন্ত্রিত বিরতি।
সন্দেহজনক লেনদেন সাময়িক থামানো। ভাইরাল সিনথেটিক কনটেন্টের বিস্তার ধীর করা। উচ্চঝুঁকির AI কার্যক্রমে শক্তিশালী সুরক্ষা প্রয়োগ করা। উদ্ভাবন দ্রুত এগিয়ে যাক। কিন্তু অপরিবর্তনীয় ক্ষতি যেন দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে।
পঞ্চম স্তম্ভ: ঘটনা-পরবর্তী সেবা ও পুনরুদ্ধার
দ্রুত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ, কার্যকর প্রতিকার, ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা এবং ডিজিটাল পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে হবে।
এই পাঁচটি স্তম্ভকে একে অন্যকে রক্ষা করতে হবে। মানুষ ভুল করলে প্রযুক্তি তা শনাক্ত করতে সাহায্য করবে। প্রযুক্তি ব্যর্থ হলে প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে। আর ক্ষতি ঘটলে ভুক্তভোগীকে একা ফেলে রাখা যাবে না। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে, বাংলাদেশসহ, প্রযুক্তিসহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা বা TFGBV উদ্বেগজনক ও নজিরবিহীন হারে বাড়ছে।
Leaders TalkX 9-এর আলোচনাও স্বীকার করে যে ডিজিটাল হুমকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত, আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি এখনো বড় এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থায়িত একটি চ্যালেঞ্জ। তাই WSIS যখন WSIS 2035 এবং ‘Digital Development for All’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা শুধু কত মানুষ সংযুক্ত হয়েছে, তা মাপব না। আমাদের মাপতে হবে: কত মানুষ নিরাপদে, সুরক্ষিতভাবে এবং আস্থার সঙ্গে ডিজিটাল সমাজে অংশ নিতে পারছে।
শুধু AI কত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, তা নয়।
প্রশ্ন হলো: আমাদের সমাজ AI-কে কতটা নিরাপদভাবে গ্রহণ করতে পারছে? আমরা ডিজিটাল সড়ক তৈরি করেছি। AI সেই সড়কে আরও দ্রুতগতির যান নামাচ্ছে। এখন প্রয়োজন সিগন্যাল, নিরাপত্তামান, গতি ব্যবস্থাপনা, জরুরি সাড়া এবং যৌথ দায়িত্ব। কারণ একটি সত্য সড়ক ও সাইবার জগৎ উভয়ের জন্যই সমান: মানুষ ভুল করবে। কিন্তু একটি দায়িত্বশীল ডিজিটাল ব্যবস্থা সেই ভুলকে বিপর্যয়ে পরিণত হতে দেবে না।
(গত ৯ জুলাই সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ‘জাতিসংঘ ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (WSIS) ফোরাম ২০২৬’ এ ‘সাইবার আস্থা: একটি ডিজিটাল সেফ সিস্টেম’ পদ্ধতি (হাই-লেভেল লিডার্স টকএক্স ৯’-এ এই বক্তব্য বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)- এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশের দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর এ এইচ এম বজলুর রহমান।)




