ভারি বর্ষণ ও উজানের ঢলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে বহু মানুষ ঘরবাড়ি, ফসল ও জীবিকার ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও দিন কাটাচ্ছেন। হঠাৎ নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হওয়া, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হারানোর আশঙ্কা এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা অনেকের মনে ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্যোগের সময় শারীরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের একজন সদস্য যদি শান্ত ও স্থির থাকতে পারেন, তাহলে সেই ইতিবাচক প্রভাব অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।
বাস্তবতা মেনে নেওয়ার চেষ্টা করুন
দুর্যোগের সময় সব পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। তাই যা পরিবর্তন করা যাবে না, তা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন না হয়ে বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। কী হারিয়েছেন, তা নিয়ে বারবার ভাবার পরিবর্তে এখন কী করা প্রয়োজন, সেদিকে মনোযোগ দিন। ছোট ছোট বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত কঠিন সময় মোকাবিলায় সহায়তা করে।
পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলুন
বন্যার সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করুন। কে কী নিয়ে চিন্তিত, কার কী প্রয়োজন—এসব বিষয়ে নিয়মিত কথা বললে মানসিক চাপ কমে। একে অপরকে সাহস ও সমর্থন দিলে অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়।
শিশুদের আশ্বস্ত করুন
শিশুরা বড়দের আচরণ দেখে পরিস্থিতি বুঝতে শেখে। তাই তাদের সামনে অতিরিক্ত আতঙ্ক বা হতাশা প্রকাশ না করাই ভালো। সহজ ভাষায় পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলুন এবং জানান, সবাই মিলে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করছেন। গল্প শোনা, ছবি আঁকা, গান শোনা বা ছোটখাটো খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের ব্যস্ত রাখলে তাদের মানসিক চাপ কমে।
গুজব এড়িয়ে চলুন
দুর্যোগের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। তাই শুধু সরকারি সংস্থা, আবহাওয়া অধিদপ্তর বা বিশ্বস্ত সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর করুন। যাচাই না করা কোনো খবর অন্যদের কাছে ছড়িয়ে দেবেন না।
যতটা সম্ভব দৈনন্দিন রুটিন বজায় রাখুন
বন্যার কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হলেও সময়মতো খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান, প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন এবং সুযোগ পেলেই বিশ্রাম নেওয়ার চেষ্টা করুন। এসব ছোট অভ্যাস মানসিক স্থিরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
দায়িত্ব ভাগাভাগি করুন
পরিবারের সব দায়িত্ব একজনের ওপর না চাপিয়ে সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দিন। কেউ খাবারের দায়িত্ব নেবে, কেউ শিশু বা বয়স্কদের দেখাশোনা করবে, আবার কেউ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখবে। এতে সবার অংশগ্রহণ বাড়ে এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি কমে।
নিজের শরীরের যত্ন নিন
শারীরিক সুস্থতা মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পর্যাপ্ত খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম এবং যতটা সম্ভব পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের চেষ্টা করুন। ঘুমের অভাব বা পানিশূন্যতা উদ্বেগ ও মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রয়োজন হলে সহায়তা নিন
যদি দীর্ঘদিন ভয়, উদ্বেগ, অনিদ্রা বা হতাশা কাটিয়ে উঠতে না পারেন, তাহলে চিকিৎসক, কাউন্সেলর বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর সহায়তা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি প্রতিবেশী, স্বেচ্ছাসেবক বা আত্মীয়দের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চাইতে দ্বিধা করবেন না।
বন্যার মতো দুর্যোগ স্থায়ী নয়। তবে এই কঠিন সময়ে পরিবারের সদস্যরা যদি একে অপরের পাশে থাকেন, তাহলে সংকট মোকাবিলা অনেক সহজ হয়ে ওঠে। মনে রাখতে হবে, দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বড় শক্তি হলো পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও ভালোবাসা।
সূত্র: ইউনিসেফ, ভিটা হেলথ গ্রুপ ও মিডিয়াম



