নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর: সব পুরস্কারের পেছনে একটি গল্প থাকে। মো. মনির হোসেনের জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫-এর গল্পটি শুরু হয়নি কোনো মঞ্চে, কোনো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কিংবা আলোঝলমলে আয়োজনে।
গল্পটির শুরু বহু বছর আগে, একটি নদীর পাড়ে। যেখানে তিনি প্রথম উপলব্ধি করেছিলেন-নদী হারিয়ে গেলে কেবল পানি নয়, হারিয়ে যায় মানুষের ইতিহাস, জীবিকা, সংস্কৃতি এবং একটি জনপদের অস্তিত্ব।
সেই উপলব্ধিই ধীরে ধীরে বদলে দেয় একজন শিক্ষকের জীবনের পথচলা। পাঠ্যবইয়ের পাঠদানের পাশাপাশি তিনি শুরু করেন নদীকে মানুষের কাছে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রা। সেই যাত্রারই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মিলেছে এবার।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত ৭ জুন জারি করা প্রজ্ঞাপনে পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও প্রচার (ব্যক্তিগত পর্যায়) বিভাগে জাতীয় পরিবেশ পদক-২০২৫-এর জন্য মনোনীত করেছে বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের প্রতিষ্ঠাতা মো. মনির হোসেনকে।
তার পরিচয়ের শুরু একজন শিক্ষক হিসেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও অনেক দায়িত্ব। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, নদী, পরিবেশ ও পর্যটনবিষয়ক প্রকাশনা ‘নদীকাহন’-এর সম্পাদক এবং প্রকৃতি বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘প্রকৃতিবার্তা’-এর নিয়মিত লেখক।
২০০৯ সাল থেকে নদী ও পরিবেশ সংরক্ষণকে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগের সীমায় আটকে রাখেননি। একে রূপ দিয়েছেন সামাজিক আন্দোলনে। তিনি বিশ্বাস করেন, আইন দিয়ে নদী রক্ষা করা সম্ভব হলেও, মানুষের মন জয় না করলে নদী টিকে থাকবে না। আর সেই কারণেই তার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ ছিল শিক্ষা ও সচেতনতা।

এই বিশ্বাসকে বাস্তবে রূপ দিতে তিনি দেশ-বিদেশের প্রায় ২৫০টি নদী ঘুরে দেখেছেন। নদীপাড়ের প্রায় লক্ষাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। শুনেছেন তাদের জীবনসংগ্রাম, নদীভাঙনের বেদনা, আবার কোথাও দেখেছেন নদীকেন্দ্রিক সম্ভাবনার নতুন গল্প। সেই অভিজ্ঞতা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন সভা-সেমিনার, প্রশিক্ষণ, লেখালেখি এবং জনসম্পৃক্ত নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে।
নদী নিয়ে তার গবেষণাধর্মী নিবন্ধ ও প্রবন্ধ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়ে আসছে। একই সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেছেন, নদী রক্ষার আন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার বিকল্প নেই।
এই ভাবনা থেকেই দেশের ৪৪টি জেলায় গড়ে তুলেছেন সহস্রাধিক নদী সংরক্ষণকর্মীর একটি নেটওয়ার্ক। ২০১৬ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করছেন জাতীয় নদী সম্মেলন, জাতীয় নদী উৎসব, পার্বত্য নদী সম্মেলন এবং উপকূলীয় নদী সম্মেলন। এসব আয়োজন এখন নদীকেন্দ্রিক জনসচেতনতা তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত।
তার উদ্যোগে চালু হওয়া ‘রিভার টক’ শুধু একটি অনলাইন অনুষ্ঠান নয়; এটি নদী নিয়ে মুক্ত আলোচনা ও জ্ঞান বিনিময়ের একটি পরিসর। অন্যদিকে ‘এসো নদীর গল্প শুনি’ পাঠচক্রের মাধ্যমে তরুণদের কাছে নদীকে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বাস্তবতায় তুলে ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি রচনা প্রতিযোগিতা, বক্তৃতা প্রতিযোগিতা এবং ইয়ং রিভার চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের মাধ্যমে তিনি নদীকেন্দ্রিক নেতৃত্ব গড়ে তুলছেন।
নদী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যেও রয়েছে তার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। ২০২৪ সালে তিনি চালু করেন ‘মার্ক এঞ্জেলো রিভার অ্যাওয়ার্ড’, যার নামকরণ করা হয়েছে বিশ্ব নদী দিবসের প্রবর্তক নদী অধিকারকর্মী মার্ক এঞ্জেলো-এর নামে।
গবেষক, লেখক ও নির্মাতা হিসেবেও রয়েছে তার স্বতন্ত্র পরিচয়। ‘গাজীপুরের নদী’, ‘পার্বত্য অঞ্চলের নদী’ এবং ‘নদী ও জলে ভ্রমণ’-এই তিনটি বইয়ে তিনি নদীর বাস্তবতা, সংকট ও সম্ভাবনার নানা দিক তুলে ধরেছেন। এছাড়া নির্মাণ করেছেন ১১টি প্রামাণ্যচিত্র। এর মধ্যে ‘শঙ্খ নদী: দ্য আমাজন অব বেঙ্গল’ প্রামাণ্যচিত্রের জন্য ২০১৯ সালে তিনি ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন।
তার কাজের পরিধি দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পৌঁছেছে। তার নেতৃত্বে মালয়েশিয়ার গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট সেন্টারের সঙ্গে জ্ঞান বিনিময়বিষয়ক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জাতীয় পরিবেশ পদক অর্জনের অনুভূতি জানাতে গিয়ে মো. মনির হোসেন বলেন, “যেকোনো পুরস্কার মানুষকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করে। একই সঙ্গে এটি কাজের পরিধি বাড়িয়ে দেয় এবং দায়িত্ববোধ আরও গভীর করে। এই স্বীকৃতি আমাকে নতুন করে অনুপ্রেরণা দিয়েছে-আমি যে কাজটি করে আসছি, তা আরও বিস্তৃতভাবে ও দৃঢ় প্রত্যয়ে চালিয়ে যেতে চাই।”

তিনি বলেন, “আমার মূল লক্ষ্য পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও তার ব্যাপক প্রচার, বিশেষ করে নদী বিষয়ক শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি। কারণ নদী বিষয়ক শিক্ষা না থাকলে যথাযথ জ্ঞান তৈরি হয় না; জ্ঞান না থাকলে দক্ষতা গড়ে ওঠে না; আর দক্ষতা না থাকলে সচেতনতা সৃষ্টি হয় না। সচেতনতা ছাড়া নদী ও পরিবেশ সংরক্ষণ সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে নদী বিষয়ক শিক্ষা ও প্রচারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে নদী ভাবনা তৈরি করার চেষ্টা করে আসছি। ভবিষ্যতেও এই কাজ অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে ভাই, বন্ধু এবং আগামী প্রজন্মের শক্তিশালী তরুণদের নদী ভাবনায় উদ্বুদ্ধ করাই আমার প্রধান লক্ষ্য। কারণ তরুণ প্রজন্মই পারে নদী ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করে তুলতে।”
নদীকে কেন্দ্র করে তার এই দীর্ঘ পথচলা প্রমাণ করে, পরিবর্তনের শুরু সবসময় বড় কোনো সিদ্ধান্ত দিয়ে হয় না। কখনও কখনও একটি নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে জন্ম নেওয়া একটি প্রশ্নই বদলে দিতে পারে একজন মানুষের জীবন। আর সেই মানুষটিই একসময় হয়ে ওঠেন হাজারো মানুষের নদী ভাবনার প্রেরণা।


