বড় দলের পক্ষে প্রভাব বিস্তার, ফিফার বিরুদ্ধে অভিযোগের আসল রহস্য | চ্যানেল আই অনলাইন

বড় দলের পক্ষে প্রভাব বিস্তার, ফিফার বিরুদ্ধে অভিযোগের আসল রহস্য | চ্যানেল আই অনলাইন

আর্জেন্টিনা মিশরের বিপক্ষে ৩-২ গোলে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল, কিন্তু ম্যাচ শেষে খেলা নিয়ে যত না কথা হলো, তার চেয়ে বেশি কথা হলো রেফারিং নিয়ে। মোহামেদ সালাহর ওপর একটা ফাউল যেভাবে এড়িয়ে যাওয়া হলো, মিশরের একটা গোল যেভাবে ভিএআর পর্যালোচনায় বাতিল হলো, তাতে সামাজিক মাধ্যমে হইচই পড়ে গেছে, ফরাসি রেফারি ফ্রঁসোয়া লেতেক্সিয়ে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ আখ্যা পেতে শুরু করেছেন অনেকের কাছে।

মিশরের কোচ হোসাম হাসানতো সরাসরিই বলেছেন, ‘নিজেদের ব্যবসার জন্য ফিফা আর্জেন্টিনা ও মেসিকে রেখে দিতে চায়। যদি তারা আর্জেন্টিনার জয়ই চেয়েছে তাহলে অন্য দলগুলোকে অংশগ্রহণ করতে আহ্বান জানায় কেন? ম্যাচটি সম্পূর্ণ কারচুপি ছিল। পুরো বিশ্ব এটি দেখেছে। আমরা আর্জেন্টিনার চেয়ে ভালো ছিলাম। ফুটবল ফেয়ার নয়।’

এই অভিযোগের পেছনে একটা যুক্তি সবসময় থাকে, বড় দল বা প্রভাবশালী পক্ষ টিকে থাকলে ফিফার লাভ, তাই ফিফা নাকি চায় তারা সহজে এগিয়ে যায়।

প্রশ্ন বা অভিযোগের জবাব আসলে অতটা সহজ না। তিনটি দৃষ্টিভঙ্গীতে বিষয়টি ভাবা দরকার, প্রথমত, ফিফার আসলেই কি এমন আর্থিক স্বার্থ আছে? দ্বিতীয়ত, রেফারিং সিদ্ধান্তে সেই স্বার্থের কোনো প্রভাব পাওয়া যায় কিনা? আর তৃতীয়ত, ফিফার প্রশাসনিক পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব খাটার কোনো প্রমাণিত ঘটনা আছে কিনা?

আর্থিক স্বার্থটা বাস্তব, ইতিহাসে প্রমাণ আছে

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে এক সপ্তাহের মধ্যেই জার্মানি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা তিনটে সবচেয়ে বড় ফুটবল শক্তিই ছিটকে যায়। ফক্স স্পোর্টসের গবেষণা প্রধান মাইকেল মালভিহিল তখন বলেছিলেন, মেসি রোনালদো নেইমারের মতো তারকারা আমেরিকান দর্শকদের কাছে যেকোনো অ-আমেরিকান তারকার সমান, তাদের বিদায়েই টুর্নামেন্টের জৌলুস কমে যায়।বড় দলের পক্ষে প্রভাব বিস্তার, ফিফার বিরুদ্ধে অভিযোগের আসল রহস্য | চ্যানেল আই অনলাইন

সেই বিশ্বকাপের ফাইনালে (ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া) যুক্তরাষ্ট্রে দর্শক ছিল ১৭৮ লাখ, যেখানে ২০১৪ সালের জার্মানি-আর্জেন্টিনা ফাইনালে ছিল ২৬৭ লাখ। উল্টো দিকে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনা নিজেই ফাইনালে উঠলে দর্শক দাঁড়ায় ২২৩ লাখে, মার্কিন টিভি ইতিহাসে পঞ্চম সর্বোচ্চ।

স্পনসরদের হিসাবেও এই একই প্যাটার্ন ধরা পড়ে, বরং আরও স্পষ্টভাবে। ২০১৮ বিশ্বকাপ চলাকালীন এক মাসে এডিডাসের শেয়ার পড়ে যায় প্রায় ৬ শতাংশ, কারণ তাদের দুটো সবচেয়ে বড় ভরসার দল জার্মানি আর আর্জেন্টিনা দুটোই আগেভাগে বিদায় নেয়, মেসিকে তখনকার একটা প্রতিবেদনে সরাসরি ‘এডিডাসের সবচেয়ে বড় তারকা’ বলে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে ফাইনালিস্ট ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়ার স্পনসর নাইকির শেয়ার বেড়ে যায় ৪ শতাংশ, যেখানে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক বেড়েছিল মাত্র ১ শতাংশ, অর্থাৎ পুরো বাজারের সাধারণ ওঠানামার চেয়ে এই দুই কোম্পানির শেয়ারের হেরফের ছিল অনেক বেশি স্পষ্ট। উল্টো দিকে ২০১৪ বিশ্বকাপে যখন জার্মানি আর আর্জেন্টিনা দুটো এডিডাস দলই ফাইনালে ওঠে, সেই বছর এডিডাস ফুটবল থেকে আয় করে প্রায় ২১০ কোটি ইউরো, যার এক-তৃতীয়াংশই আসে চ্যাম্পিয়ন জার্মানির জার্সি বিক্রি থেকে।

এবারের ২০২৬ বিশ্বকাপে ছবিটা আবার উল্টে গেছে। নাইকির শেয়ার এ বছর ইতিমধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ পড়ে গেছে, কিন্তু সেটা কোনো একটা দলের বিদায়ের কারণে না, বরং কোম্পানির দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক টানাপোড়েনের কারণে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন অবশ্য নাইকিই এগিয়ে, প্রথম দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নাইকির পণ্য বিক্রি বেড়েছে ২৮ শতাংশ, এডিডাসের মাত্র ৭ শতাংশ। আর এডিডাসের শেয়ার এ বছর সার্বিকভাবে বেড়েছে, কারণ তারা এখনো ফিফার অফিশিয়াল স্পন্সর, আর মেসির আর্জেন্টিনা এখনো টুর্নামেন্টে টিকে আছে। অর্থাৎ আর্জেন্টিনা বাদ পড়লে এডিডাসের জার্সি বিক্রির একটা নির্দিষ্ট অংশে প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু পুরো কোম্পানির শেয়ারদরে সেটা মিশে যায় আরও অনেক বড় ব্যবসায়িক কারণের সঙ্গে।

অর্থাৎ বড় দল টিকে থাকা মানেই বেশি দর্শক, বেশি বিজ্ঞাপনের টাকা, স্পনসরদের বেশি লাভ, এটা অনুমান না, সংখ্যায় প্রমাণিত, তবে একক কোনো ম্যাচের ফল কোম্পানির সামগ্রিক শেয়ারদরের একমাত্র নিয়ন্ত্রক না। এই জায়গা থেকেই সন্দেহটা জন্ম নেয়।

রেফারিংয়ে অভিযোগ আর প্রমাণ

স্বার্থ থাকা এক জিনিস, সেই স্বার্থ অনুযায়ী কাজ হওয়া আরেক জিনিস। এবারের বিশ্বকাপেই আর্জেন্টিনা-আলজেরিয়া ম্যাচে মেসির একটা স্টাডস আপ ট্যাকল রেফারির চোখ এড়িয়ে যায়, আলজেরিয়া সরাসরি ফিফায় অভিযোগ জানায়। ঐতিহাসিকভাবেও কথাটা নতুন না, ১৯৮৬ সালের ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, ১৯৬৬ সালের ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিতর্কিত গোল, এসবই পুরনো উদাহরণ।

একাডেমিক গবেষণাও কিছুটা এই দিকে ইঙ্গিত করে, নরওয়ের একটা গবেষণায় দেখা গেছে সফল দলগুলো পেনাল্টি সিদ্ধান্তে একটু বেশি সুবিধা পায়, স্পেনের লা লিগা নিয়ে করা আরেকটা গবেষণায় দেখা গেছে বড় দল এগিয়ে থাকলে রেফারি ইনজুরি টাইম কম দেন। তবে এই গবেষণা একতরফা না, বাস্কেটবলে করা একটা গবেষণায় এমন কোনো পক্ষপাত পাওয়া যায়নি, আরেকদল গবেষক বলছেন প্রমাণ পরিস্থিতিভেদে বদলে যায়, খুব শক্তপোক্ত না।

এবার একটা প্রমাণিত ঘটনা, রাজনৈতিক চাপ

তবে এবারের বিশ্বকাপেই (২০২৬) এমন একটা ঘটনা ঘটেছে, যা আর অনুমান বা পরিসংখ্যানের গবেষণা না, সরাসরি খোলামেলা ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুন বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে লাল কার্ড দেখেন, যার ফলে পরের ম্যাচে তার খেলা নিষিদ্ধ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনোকে ফোন করে এই সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার অনুরোধ জানান, আর ফিফা এক অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তে শৃঙ্খলাবিধির ২৭ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দেয়, লাল কার্ড পেয়ে বহিষ্কার হওয়া বালোগুন বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচে খেলার সুযোগ পান।

বেলজিয়ামের ফুটবল সংস্থা আর উয়েফা দুটোই এই সিদ্ধান্তকে ফিফার নিজের নিয়মের লঙ্ঘন বলে অভিযোগ তোলে, এমনকি বেলজিয়ামের একজন মন্ত্রীও এটাকে ‘দুর্বোধ্য সিদ্ধান্ত’ বলে সমালোচনা করেন। ইনফান্তিনো অবশ্য দাবি করেন, তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন সিদ্ধান্তটা স্বাধীন বিচারিক সংস্থার হাতে, তিনি হস্তক্ষেপ করেননি।

মজার বিষয় হলো, এর প্রায় হুবহু একটা নজির আছে ইতিহাসে। ১৯৬২ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের গারিঞ্চাকে লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল, কিন্তু স্বাগতিক দেশ চিলির প্রেসিডেন্ট জর্জ আলেসান্দ্রির হস্তক্ষেপে অভিযোগ আছে তাকে ফাইনালে খেলতে দেওয়া হয়, যে ফাইনালে ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হয়। অর্থাৎ ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনেতার হস্তক্ষেপে ফিফার শৃঙ্খলাবিধি বেঁকে যাওয়ার এটা প্রথম ঘটনা না।

এই ঘটনাটা আলাদা কারণ এখানে ইনফান্তিনোর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার একটা দীর্ঘ প্রেক্ষাপটও আছে। কাতার বিশ্বকাপের আগে স্টেডিয়াম নির্মাণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে তাকে জবাবদিহি করতে হয়েছিল, ২০৩৪ বিশ্বকাপ সৌদি আরবকে দেওয়ার সিদ্ধান্তও সমালোচিত হয়েছে, আর গত ডিসেম্বরে ফিফা ট্রাম্পকে প্রথমবারের মতো ‘ফিফা শান্তি পুরস্কার’ দেয়, যেটা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।

বিপক্ষে যা আছে

তবে এই তিন ধরনের তথ্যকে জোড়া লাগিয়ে একটা সরল ষড়যন্ত্র তত্ত্বে পৌঁছানো ঠিক না।
প্রথমত, রেফারি পক্ষপাত নিয়ে গবেষণা একতরফা না, প্রমাণ পরিস্থিতিভেদে বদলে যায়।
দ্বিতীয়ত, বালোগুনের ঘটনাটা ‘বড় দলের পক্ষে রেফারিং’ না, বরং একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ঘটনা, যেটা মাঠের সিদ্ধান্ত না, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আর সেটার সমালোচনা ফুটবল বিশ্বের প্রায় সবাই একযোগেই করেছে, ইউরোপিয়ান কমিশনার থেকে শুরু করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত।
তৃতীয়ত, ২০১৮ সালের দর্শক কমার পেছনের বড় কারণ শুধু আর্জেন্টিনা জার্মানির বিদায় না, এটা সব বিশ্বকাপের স্বাভাবিক ঘটনা। আর ফিফার বিরুদ্ধে সরাসরি এমন কোনো প্রমাণ নেই যে তারা পদ্ধতিগতভাবে রেফারিদের নির্দেশ দেয় বড় দলের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিতে।

তাহলে সিদ্ধান্তটা কী

স্বার্থ, সন্দেহ আর প্রমাণ, এই তিনটি আলাদা জিনিস। ফিফার আর্থিক স্বার্থ বড় দল বা প্রভাবশালী পক্ষ টিকে থাকায়, এটা সংখ্যায় প্রমাণিত সত্যি। রেফারিং সিদ্ধান্তে বড় দলের পক্ষে সামান্য মনস্তাত্ত্বিক ঝোঁক থাকার একটা মিশ্র একাডেমিক ইঙ্গিত আছে, প্রমাণিত সত্য না। আর প্রশাসনিক পর্যায়ে রাজনৈতিক চাপে ফিফার নিয়ম বেঁকে যাওয়ার একটা সুনির্দিষ্ট সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত এখন সত্যিই আছে, ট্রাম্প-বালোগুনের ঘটনা। তিনটি মিলিয়ে বলা যায়, ফিফা ইচ্ছাকৃতভাবে মাঠের ফলাফল ঠিক করে দেয় এমন প্রমাণ নেই, কিন্তু প্রভাবশালী পক্ষের সামনে ফিফার নিয়ম নমনীয় হয়ে যাওয়ার প্রমাণ হাতেনাতে আছে।

ফুটবল একটা আবেগের জায়গা, আর সেই আবেগ থেকেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সহজে জোর পায়, কারণ কোটি মানুষের কাছে নিজের দলের হার মেনে নেওয়ার চেয়ে বাইরের কোনো অদৃশ্য হাতকে দোষ দেওয়া সহজ। আর যখন বালোগুনের মতো একটা ঘটনা সত্যিই ঘটে যায়, রাষ্ট্রপ্রধানের ফোনে নিয়ম বদলে যাওয়ার মতো ঘটনা বাস্তবে দেখা যায়, তখন সেই ষড়যন্ত্র তত্ত্বগুলো আরও বেশি জোর পেয়ে যায়, কারণ এবার সন্দেহের পাশে একটা সত্যিকারের উদাহরণও দাঁড়িয়ে থাকে।

Scroll to Top