
ঢাকা, ৭ জুলাই – ঢাকাবাসীর জন্য আবারও এক লজ্জাজনক ও নির্মম সত্য সামনে এলো। কোনো যুদ্ধবিগ্রহ বা বোমা হামলা না হওয়া সত্ত্বেও স্রেফ অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা এবং ভঙ্গুর অবকাঠামোর কারণে বিশ্বের অন্যতম ‘বসবাস অযোগ্য’ শহরের তকমা ধরে রেখেছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা।
ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU)-এর প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে (Global Liveability Index) বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। অর্থাৎ, গত বছর ২০২৫ সালের মতোই ঢাকা বিশ্বের তৃতীয় সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর হিসেবে নিজের স্থান ‘পাকা’ করে রেখেছে। ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল গৃহযুদ্ধে তছনছ হওয়া লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি (১৭২তম) এবং সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক (১৭৩তম)।
১০০-তে মাত্র ৪২! কোন খাতে কত নম্বর পেল ঢাকা?
আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো—এই ৫টি প্রধান ক্যাটাগরির ৩০টিরও বেশি সূচক বিশ্লেষণ করে এই তালিকা তৈরি করা হয়। এবারের জরিপে ১০০ নম্বরের মধ্যে ঢাকার সামগ্রিক স্কোর মাত্র ৪২।
ঢাকার ব্যবচ্ছেদ করলে ভেতরের কঙ্কালসার রূপটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
- অবকাঠামো (রাস্তাঘাট, ট্রাফিক, গণপরিবহন): মাত্র ২৭ (সবচেয়ে শোচনীয়)
- সংস্কৃতি ও পরিবেশ: ৪১
- স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা: ৪২
- স্থিতিশীলতা: ৪৫
- শিক্ষা খাত: ৬৭ (তুলনামূলক ভালো)
প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে কিছুটা ভালো করলেও অবকাঠামো এবং স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘস্থায়ী পঙ্গুত্ব ঢাকাকে টেনে তলানির দিকে নামিয়ে রাখছে। যেখানে এশিয়ার গড় স্কোর ৭৪, সেখানে ঢাকা আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে ৩২ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে!
যুদ্ধ ছাড়াই কেন এই দশা? পাকিস্তানের করাচিও ঢাকার ওপরে!
সূচকে একটি বড় পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ইউক্রেনের কিয়েভ (১৬৬তম) বা ইরানের তেহরান (১৬৪তম) যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে তালিকার তলানির দিকে নেমে গেছে। কিন্তু ঢাকার এই পতনের পেছনে কোনো যুদ্ধ নেই, আছে বছরের পর বছর ধরে চলা দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতা ও নাগরিক সুবিধার অভাব। এমনকি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের করাচিও ৪৩ স্কোর নিয়ে ঢাকার চেয়ে এক ধাপ ওপরে (১৭০তম) অবস্থান করছে।
টানা দুই বছর বিশ্বসেরা কোপেনহেগেন, সেরা ২০-এ এশিয়ার আধিপত্য
একদিকে ঢাকা যখন তলানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে, অন্যদিকে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভিয়েনা ও মেলবোর্ন।
সবচেয়ে আশার কথা হলো, এবার চীনের স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপক উন্নতি এবং জাপানের অগ্রগতির ওপর ভর করে সামগ্রিকভাবে এশিয়া অঞ্চলে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। যার ফলে সেরা ২০টি বাসযোগ্য শহরের তালিকায় এবার এশিয়ারই ৯টি শহর জায়গা করে নিয়েছে। তবে ঢাকা সেই আঞ্চলিক সুফল থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।
এক নজরে বিশ্বের শীর্ষ ১০ বাসযোগ্য শহর (২০২৬):
১. কোপেনহেগেন (ডেনমার্ক)
২. ভিয়েনা (অস্ট্রিয়া)
৩. মেলবোর্ন (অস্ট্রেলিয়া)
৪. সিডনি (অস্ট্রেলিয়া)
৫. জুরিখ (সুইজারল্যান্ড)
৬. জেনেভা (সুইজারল্যান্ড)
৭. ওসাকা (জাপান)
৮. অ্যাডিলেড (অস্ট্রেলিয়া)
৯. ভ্যাঙ্কুভার (কানাডা)
১০. টোকিও (জাপান)
২০২৩ সালে ঢাকা ছিল ১৬৬তম, ২০২৪ সালে ১৬৮তম, আর ২০২৫ ও ২০২৬ সালে এসে তা ১৭১ নম্বরে আটকে গেছে। এই ধারাবাহিক পতন প্রমাণ করে, মুখে মেগাপ্রজেক্টের বুলি আওড়ালেও সাধারণ মানুষের জন্য ঢাকা দিন দিন এক অবাসযোগ্য কংক্রিটের জঙ্গল হয়ে উঠছে। নীতি-নির্ধারকদের ঘুম কি এবার ভাঙবে?
এনএন/ ৭ জুলাই ২০২৬






