আধুনিক বিশ্বের আলোকব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানো নীল এলইডির অন্যতম উদ্ভাবক জাপানি নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী শুজি নাকামুরা এবার আরও বড় এক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন। তার স্বপ্ন, এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করা যা পারমাণবিক সংযোজন (নিউক্লিয়ার ফিউশন) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় সীমাহীন ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে।

৭২ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানীর বিশ্বাস, নতুন প্রজন্মের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্পন্দিত লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে ভবিষ্যতে বিশ্বের জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব হবে।
নীল এলইডি আবিষ্কারের সাফল্য
২০১৪ সালে নীল আলোক-নির্গমনকারী ডায়োড (ব্লু এলইডি) আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন শুজি নাকামুরা। তার সঙ্গে যৌথভাবে এ সম্মান অর্জন করেন জাপানের বিজ্ঞানী ইসামু আকাসাকি ও হিরোশি আমানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীল এলইডি আবিষ্কার আধুনিক প্রযুক্তির ইতিহাসে বৈদ্যুতিক বাতির আবিষ্কারের মতোই যুগান্তকারী একটি ঘটনা। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, ট্রাফিক সিগন্যাল ও ইলেকট্রনিক বিজ্ঞাপনফলকসহ অসংখ্য প্রযুক্তিতে আজ এই আবিষ্কারের প্রভাব স্পষ্ট।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তা বারবারা ক্যাম্পাসে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত নাকামুরা মনে করেন, তার নতুন প্রকল্প সফল হলে তা মানবসভ্যতার জন্য আরও বড় পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে।
অবসর নয়, গবেষণাই জীবনের লক্ষ্য
যেখানে অধিকাংশ মানুষ সত্তর বছর পার হওয়ার পর অবসরজীবন বেছে নেন, সেখানে নাকামুরা এখনও নতুন উদ্ভাবনের নেশায় মগ্ন। তার মতে, অবসরজীবন অত্যন্ত একঘেয়ে।
তিনি এখন পারমাণবিক সংযোজনভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। এই প্রযুক্তির অন্যতম সুবিধা হলো এতে ইউরেনিয়ামের প্রয়োজন হয় না এবং প্রচলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার আশঙ্কাও তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
ব্যর্থতা থেকে সাফল্যের পথে
আজ তিনি বিশ্বের অন্যতম সফল বিজ্ঞানী হলেও কর্মজীবনের শুরুতে তাকে বারবার ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
১৯৭৯ সালে জাপানের একটি ছোট রাসায়নিক প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের দায়িত্ব নেন তিনি। দীর্ঘ প্রায় এক দশক গবেষণা করেও তিনি মাত্র তিনটি পণ্য উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন, যার কোনোটিই বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি।
সহকর্মীদের কটাক্ষ ও অবজ্ঞা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। অনেকেই তাকে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দিতেন। এমনকি গবেষণার পাশাপাশি একসময় তাকে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার দায়িত্বও পালন করতে হয়েছে।
কিন্তু এসব অপমান তাকে দমিয়ে দিতে পারেনি। বরং তিনি আরও দৃঢ়সংকল্প হয়ে ওঠেন।
নিজের বিশ্বাসে অটল থাকার ফল
নীল এলইডি তৈরির জন্য তিনি গ্যালিয়াম নাইট্রাইড নামের একটি উপাদান নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান। অথচ সে সময় বিশ্বের অধিকাংশ গবেষক অন্য একটি উপাদান নিয়ে কাজ করছিলেন।
এক পর্যায়ে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা লিখিতভাবে গবেষণা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি সেই নির্দেশ মানেননি। নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে গবেষণা চালিয়ে যান।
অবশেষে ১৯৯৩ সালে তার গবেষণায় আসে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। প্রথমবারের মতো তার তৈরি এলইডি থেকে নীলাভ-বেগুনি আলো নির্গত হয়।
পরদিন সকালে গবেষণাগারে ফিরে তিনি দেখেন, আলোটি এখনও জ্বলছে। সেই মুহূর্তটিকেই তিনি জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন হিসেবে মনে করেন।
নতুন লক্ষ্য সীমাহীন পরিচ্ছন্ন শক্তি
নীল এলইডির সাফল্যের পর এখন তার সব মনোযোগ পারমাণবিক সংযোজন প্রযুক্তির দিকে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য তিনি ‘ব্লু লেজার ফিউশন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। প্রতিষ্ঠানটি এমন উন্নত লেজার প্রযুক্তি তৈরির কাজ করছে, যা ভবিষ্যতে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নাকামুরা ও তার দল ‘অপটিক্যাল এনহ্যান্সমেন্ট ক্যাভিটি’ নামে একটি বিশেষ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এর মাধ্যমে লেজারের শক্তিকে বহুগুণ বৃদ্ধি করে নিয়ন্ত্রিতভাবে ফিউশন বিক্রিয়া ঘটানো সম্ভব হয়।
২০৩২ সালের মধ্যে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎকেন্দ্র
বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা বারবারা অঞ্চলে ২০৩২ সালের মধ্যে এক গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি পরীক্ষামূলক ফিউশন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
প্রকল্পটি সফল হলে প্রায় সাত লাখ ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।
তবে নাকামুরা স্বীকার করেন, সেই লক্ষ্য অর্জনের আগে এখনও অনেক গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন।
তরুণদের প্রতি বার্তা
তরুণ বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে শুজি নাকামুরার বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট—সফল হতে হলে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস থাকতে হবে।
তার ভাষায়, “নতুন পথে হাঁটার সাহসই পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে।”
একসময় যিনি নীল এলইডি আবিষ্কারের মাধ্যমে বিশ্বকে নতুন আলো উপহার দিয়েছিলেন, এখন তিনি মানবজাতিকে পরিচ্ছন্ন ও প্রায় সীমাহীন শক্তির নতুন যুগে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো যুগান্তকারী পরিবর্তনের নায়ক হয়ে উঠতে পারেন শুজি নাকামুরা।



