শিশুরা সমাজের সবচেয়ে কোমল, নিষ্পাপ ও স্পর্শকাতর অংশ। তাদের নিরাপত্তা, সুশিক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু বর্তমান সময়ে শিশু হত্যা, অপহরণ, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার মতো ভয়াবহ অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব ঘটনা শুধু মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ই নয়, ইসলামের মৌলিক শিক্ষারও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

ইসলাম শিশুর জীবন, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ রক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের প্রতি স্নেহ-মমতা প্রদর্শনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, “যে ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৯১৯)
মানবজীবনের মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি কোনো প্রাণকে হত্যা করল—প্রাণের বিনিময় বা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি ছাড়া—সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।” (সুরা মায়িদা, আয়াত : ৩২)
শিশুর জীবন সুরক্ষার বিষয়টি ইসলাম জন্মের আগেই নিশ্চিত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে নিজেদের সন্তানদের হত্যা কোরো না। আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও।” (সুরা বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৩১)
যদিও এ আয়াত জাহেলি যুগে কন্যাশিশু হত্যার প্রেক্ষাপটে অবতীর্ণ হয়েছিল, এর শিক্ষা সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য। কোনো অজুহাতেই শিশুর জীবন নষ্ট করা বৈধ নয়। ফলে শিশু হত্যা, অপহরণ কিংবা নির্যাতনের মতো অপরাধ ইসলামের দৃষ্টিতে চরম নিন্দনীয়।
বর্তমান সময়ের আরেকটি ভয়াবহ সংকট হলো শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা পরিচিত পরিবেশেই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইসলাম এ ধরনের অপরাধকে অত্যন্ত গুরুতর হিসেবে বিবেচনা করে। ইসলামী আইন অনুযায়ী ধর্ষণ শুধু ব্যভিচার নয়; এর সঙ্গে বলপ্রয়োগ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সম্ভ্রমহানির মতো একাধিক অপরাধ জড়িত থাকে। তাই এটি কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য।
ইসলামী আইনজ্ঞদের মতে, যদি কোনো ধর্ষণের ফলে শিশুর মৃত্যু ঘটে, তবে অপরাধীর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। কারণ এখানে শুধু সম্ভ্রমহানি নয়, একটি নিরপরাধ প্রাণেরও বিনাশ ঘটে। ইসলাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।
শিশু নির্যাতনের পেছনে অনেক সময় পারিবারিক অবহেলা ও সামাজিক দায়বোধের অভাবও কাজ করে। অথচ ইসলাম সন্তানকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত নেয়ামত ও পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “সম্পদ ও সন্তান পার্থিব জীবনের সৌন্দর্য।” (সুরা কাহফ, আয়াত : ৪৬)
সন্তান যখন জীবনের সৌন্দর্য, তখন তাদের রক্ষা করা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করাও অভিভাবকদের অন্যতম দায়িত্ব। শিশুদের সম্ভাব্য ঝুঁকি, অসৎ সঙ্গ, অনিরাপদ আচরণ ও মন্দ স্পর্শ সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। কোরআনে হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর মাধ্যমে সন্তানকে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করার শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে। তিনি পুত্র ইউসুফ (আ.)-কে বলেছিলেন, “হে আমার পুত্র! তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বর্ণনা কোরো না। তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৫)
এ শিক্ষা থেকে বোঝা যায়, শিশুদের নিরাপত্তার জন্য সচেতনতা ও সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারকে শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা যেকোনো সমস্যা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কথা নির্ভয়ে জানাতে পারে।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্র ও সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য। শিশুদের সুরক্ষার জন্য কার্যকর আইন, দ্রুত বিচার ব্যবস্থা, নৈতিক শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা একযোগে প্রয়োজন। শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও অপরাধ রোধে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
মহানবী (সা.) আদর্শ মুসলমানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, “মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার হাত ও মুখ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। আর মুমিন সেই ব্যক্তি, যার থেকে মানুষ তাদের জীবন ও সম্পদকে নিরাপদ মনে করে।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৪৯৯৫)
এই শিক্ষা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত মুসলমান কখনো অন্যের ক্ষতির কারণ হতে পারে না; বরং সে মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে। তাই শিশুদের নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে ইসলামের মানবিক শিক্ষা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রীয় কঠোরতা সমানভাবে কার্যকর করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সমাজের সব শিশুকে নিরাপদ, সুরক্ষিত ও সুন্দর জীবন দান করুন। আমিন।
প্রয়োজনে আমি এটিকে সংবাদপত্রের উপযোগী ফিচার, খুতবার বক্তব্য, বা SEO-উপযোগী ইসলামিক নিবন্ধ হিসেবেও রূপান্তর করতে পারি।



