২০২৬ বিশ্বকাপের ১৩ তারকা, যাদের বাবারাও খেলেছিলেন বিশ্বকাপ | চ্যানেল আই অনলাইন

২০২৬ বিশ্বকাপের ১৩ তারকা, যাদের বাবারাও খেলেছিলেন বিশ্বকাপ | চ্যানেল আই অনলাইন

২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন প্রজন্মের অনেক তারকার পেছনে আছে বিশ্বকাপ খেলা বাবাদের গল্প। এবারের বিশ্বকাপে এমন কয়েকজন ফুটবলার আছেন, যাঁদের বাবারাও একসময় বিশ্বকাপ খেলেছিলেন। নরওয়ে তিন সাবেক বিশ্বকাপ খেলা ফুটবলারের তিন ছেলেকে এবার একসঙ্গে মাঠে নামিয়ে ইতিহাস গড়েছে, আর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনায় খেলছেন ১৯৯৮ বিশ্বকাপের দুই সতীর্থের দুই ছেলে। আর ফ্রান্সের ফুটবল কিংবদন্তি জিদানের নামটা ফিরছে গোলপোস্টে, তবে ফ্রান্সের হয়ে নয়, আলজেরিয়ার জার্সিতে।

এবারের আসরে অন্তত ১৩ জন ফুটবলার আছেন, যাঁদের বাবারাও একসময় ফুটবলের মহা-আসর বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।

নরওয়ের তিন পিতার তিন পুত্র

গল্পটা শুরু হয়েছিল ৩২ বছর আগে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইতালির বিপক্ষে নরওয়ের একাদশে একসঙ্গে ছিলেন আল্ফ-ইঙ্গে হালান্ড, গোরান সরলথ এবং গোলরক্ষক এরিক থরস্টভেট। এবার সেই তিনজনের তিন ছেলে, আর্লিং হালান্ড, আলেক্সান্ডার সরলথ এবং ক্রিস্টিয়ান থরস্টভেট, একসঙ্গে নামলেন ইরাকের বিপক্ষে।

ফিফার তথ্য অনুযায়ী এটাই বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম, যেখানে কোনো দল একই ম্যাচে সাবেক তিন বিশ্বকাপারের তিন ছেলেকে একসঙ্গে মাঠে নামাল। আর সেই অভিষেক ম্যাচেই আর্লিং হালান্ড করে বসলেন জোড়া গোল, নরওয়ে জিতল ৪-১ ব্যবধানে। বাবা যেখানে শুরু করেছিলেন, ছেলে যেন ঠিক সেখান থেকেই গল্পটা তুলে নিলেন।

আর্জেন্টিনা: এক ড্রেসিংরুম, দুই প্রজন্ম

আর্জেন্টিনার গল্পটা শুধু পিতা-পুত্রের নয়, পুরোনো বন্ধুত্বেরও। জুলিয়ানো সিমেওনে আর নিকো পাজ, দুই তরুণ এবার আলবিসেলেস্তের জার্সিতে। আর তাঁদের বাবা দিয়েগো সিমেওনে এবং পাবলো পাজ ১৯৯৮ বিশ্বকাপে একই দলে সতীর্থ ছিলেন, কোচ দানিয়েল পাসারেইয়ার অধীনে।

আর্জেন্টিনার ইতিহাসে এই প্রথম দুজন খেলোয়াড় খেলছেন যাঁদের বাবারা বিশ্বকাপে একসঙ্গে সতীর্থ ছিলেন। দিয়েগো সিমেওনে ১৯৯৮-এ দলটির অধিনায়কই ছিলেন, আর আজ তাঁর ছেলে জুলিয়ানো আতলেতিকো মাদ্রিদে খেলেন বাবার চোখের সামনেই, কারণ দিয়েগোই সেই ক্লাবের কোচ। প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু একই নাম, একই লড়াইয়ের ঘ্রাণ।

জিদান, কিন্তু সবুজ-সাদায়!

কোনো নাম যদি বিশ্বকাপের কোনো আলোচিত হয়ে চিরস্থায়ীভাবে যুক্ত থাকে, জিনেদিন জিদান তার একটি। ১৯৯৮-এ জিনেদিন জিদান ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। এবার সেই নাম ফিরছে, তবে আক্রমণে নয়, গোলপোস্টে, আর ফ্রান্সের নীল ছেড়ে আলজেরিয়ার সবুজ-সাদায়। গ্রানাদার গোলরক্ষক লুকা জিদান পারিবারিক শিকড়ের টানে আন্তর্জাতিক আনুগত্য বদলে বেছে নিয়েছেন বাবার পূর্বপুরুষের দেশ আলজেরিয়াকে।

জিনেদিনের বাবা-মা ছিলেন আলজেরিয়ার কাবিলি অঞ্চলের, সেই সূত্রেই লুকার যোগ্যতা, আর ফিফা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর জাতীয়তা বদলের অনুমোদন দেয়। এটা শুধু একটা পরিবারের গল্প নয়, অভিবাসন আর পরিচয়েরও গল্প, যেখানে এক প্রজন্মের শিকড় পরের প্রজন্মের পতাকা ঠিক করে দেয়।

ইউরোপের চেনা পদবি

ইউরোপের কিছু নাম এবার দ্বিগুণ অর্থ বহন করছে। ফ্রান্সের মার্কাস থুরামের বাবা লিলিয়ান থুরাম ছিলেন ১৯৯৮-এর বিশ্বজয়ী দলের স্তম্ভ, খেলেছেন ২০০২ ও ২০০৬ সালেও। নেদারল্যান্ডসের জাস্টিন ক্লাইভার্ট বইছেন বাবা প্যাট্রিক ক্লাইভার্টের উত্তরাধিকার, যিনি ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডাচদের হয়ে আলো ছড়িয়েছিলেন। আর পর্তুগালের ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও খেলছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পাশে, অথচ তাঁর বাবা সের্জিও কনসেইসাও ২০০২ বিশ্বকাপে মাঠ কাঁপিয়েছিলেন সেই সময়ে, যখন রোনালদো সবে পেশাদার ফুটবলে পা রাখছেন।

আটলান্টিকের ওপারে

যুক্তরাষ্ট্রের গল্পটায় বাবা আর কোচ মিলেমিশে গেছে। জিওভানি রেইনার বাবা ক্লাউদিও রেইনা ছিলেন মার্কিন দলের অধিনায়ক, খেলেছেন পরপর কয়েকটি বিশ্বকাপে। আর সেবাস্তিয়ান বারহাল্টারের বাবা গ্রেগ বারহাল্টার শুধু ২০০২ ও ২০০৬ বিশ্বকাপে খেলেননি, পরে যুক্তরাষ্ট্র দলের কোচও হয়েছিলেন। বাবা একসময় যে জার্সি গায়ে দিয়েছিলেন, পরে যে দলকে সাইডলাইন থেকে সামলেছেন, আজ সেই দলেই খেলছেন তাঁর ছেলে।

কোরিয়ার উত্তরসূরি

এশিয়ার গল্পটা আবেগে ভরা। দক্ষিণ কোরিয়ার লি তেসোক বহন করছেন বাবা লি ইউল-ইয়ংয়ের উত্তরাধিকার, যিনি ২০০২ বিশ্বকাপে কোরিয়ার সেমিফাইনালে ওঠা সেই রূপকথার দলের অন্যতম নায়ক, তুরস্কের বিপক্ষে তাঁর ফ্রি-কিক গোল আজও ভক্তদের মনে গাঁথা।

কোরিয়ার বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় পিতা-পুত্র জুটি, আগে ছিল থাকা চা বুম-কুন এবং চা দু-রি। এবারের বিশ্বকাপে ছেলে তেসোক জাতীয় দলে পরেছেন তার বাবার সেই ১৩ নম্বর জার্সিই, আর চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে অভিষেকেই শুরুর একাদশে নেমেছিলেন বিশ্বকাপের ময়দানে।

স্কটল্যান্ডের গান’রা

স্কটল্যান্ডের গোলপোস্ট সামলাচ্ছেন অ্যাঙ্গুস গান, পরেছেন ১ নম্বর জার্সি। তাঁর বাবা ব্রায়ান গানও ছিলেন গোলরক্ষক, ১৯৯০ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের দলে। বাবা যে স্বপ্নের মঞ্চে পৌঁছেছিলেন এক প্রজন্ম আগে, ছেলে আজ সেখানে শুধু পৌঁছাননি, দলের এক নম্বর হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

শেষ কথা: উত্তরাধিকারের মাঠ

এই গল্পগুলো আসলে এক জায়গায় এসে মেলে, খেলা কেবল ব্যক্তির নয়, পরিবারেরও। বাবার পায়ের ছাপে ছেলে হাঁটে, আবার নিজের আলাদা পরিচয়ও গড়ে তোলে, যেমন লুকা জিদান বাবার ছায়া থেকে বেরিয়ে অন্য এক পতাকা বেছে নিয়েছেন। বিশ্বের ফুটবল-ক্রিকেট পরিবারগুলোতেও এই স্বপ্নটা চেনা, বাবা কিংবা মামা-চাচা একসময় মাঠ কাঁপিয়েছেন, আর নতুন প্রজন্ম সেই উত্তরাধিকার বইতে চায় আরও বড় মঞ্চে। বিশ্বকাপ তাই শুধু ৯০ মিনিটের লড়াই নয়, এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হাতবদল হওয়া এক দীর্ঘ গল্পও।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: পিতা-পুত্র জুটি
পুত্র (এবারের দল) পিতা পিতার বিশ্বকাপ
আর্লিং হালান্ড (নরওয়ে) আল্ফ-ইঙ্গে হালান্ড ১৯৯৪
আলেক্সান্ডার সরলথ (নরওয়ে) গোরান সরলথ ১৯৯৪
ক্রিস্টিয়ান থরস্টভেট (নরওয়ে) এরিক থরস্টভেট ১৯৯৪
জুলিয়ানো সিমেওনে (আর্জেন্টিনা) দিয়েগো সিমেওনে ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২
নিকো পাজ (আর্জেন্টিনা) পাবলো পাজ ১৯৯৮
মার্কাস থুরাম (ফ্রান্স) লিলিয়ান থুরাম ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬
জিওভানি রেইনা (যুক্তরাষ্ট্র) ক্লাউদিও রেইনা ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬
সেবাস্তিয়ান বারহাল্টার (যুক্তরাষ্ট্র) গ্রেগ বারহাল্টার ২০০২, ২০০৬
ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও (পর্তুগাল) সের্জিও কনসেইসাও ২০০২
জাস্টিন ক্লাইভার্ট (নেদারল্যান্ডস) প্যাট্রিক ক্লাইভার্ট ১৯৯৮
লুকা জিদান (আলজেরিয়া) জিনেদিন জিদান (ফ্রান্স) ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬
লি তেসোক (দক্ষিণ কোরিয়া) লি ইউল-ইয়ং ২০০২, ২০০৬
অ্যাঙ্গুস গান (স্কটল্যান্ড) ব্রায়ান গান ১৯৯০

Scroll to Top