হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের নতুন নির্দেশনা জারি – DesheBideshe

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের নতুন নির্দেশনা জারি – DesheBideshe


হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের নতুন নির্দেশনা জারি – DesheBideshe

তেহরান, ২০ জুন – মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ সরিয়ে এক ঐতিহাসিক মোড়! দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী বৈরিতা ভুলে অবশেষে যুদ্ধের অবসানে এক সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে বিশ্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আর এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র তিন দিনের মাথায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তেল-গ্যাস সরবরাহের লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ৫টি কড়া শর্ত ও নতুন নির্দেশনা জারি করেছে তেহরান।

ঐতিহাসিক এই ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে লেগেছে বড়সড় ধাক্কা। এক ধাক্কায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নেমে এসেছে ৮০ ডলারের নিচে, যা আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এক বিরাট স্বস্তির খবর।

ইরানি বার্তা সংস্থা ফারস জানিয়েছে, সদ্য গঠিত ‘উপসাগরীয় জলপথ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ’ সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) হরমুজ প্রণালি পারাপারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। তবে এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে চলতে গেলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে মানতে হবে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম।

কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জারি করা ৫টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা নিচে দেওয়া হলো:

  • অফিশিয়াল আবেদন: জাহাজ পারাপারের আবেদন গ্রহণ ও প্রক্রিয়াকরণের একমাত্র সরকারি মাধ্যম হিসেবে একটি নির্দিষ্ট ওয়েবসাইট (PGSA.ir) এবং ইমেইল (Info@PGSA.ir) নির্ধারণ করা হয়েছে।
  • যোগাযোগের তথ্য: আবেদনের সাথে জাহাজের অত্যন্ত কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের তথ্য দেওয়া বাধ্যতামূলক।
  • ৪৮ ঘণ্টার ডেডলাইন: হরমুজ প্রণালির প্রবেশ বা বের হওয়ার মুখে অপ্রয়োজনীয় জটলা এড়াতে জাহাজ আসার নির্ধারিত সময়ের অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে আবেদন করতে হবে।
  • ফ্রি পারাপার ও ইরানি বিমা: আগামী ৬০ দিনের জন্য কোনো জাহাজের কাছ থেকে কোনো ট্রানজিট ফি নেওয়া হবে না। এই সময়ে নিরাপত্তা, সুরক্ষা, পরিবেশগত সেবা ও বিমার সমস্ত খরচ বহন করবে ইরান সরকার।
  • রুট ও সময় সমন্বয়: জলপথের সম্ভাব্য নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি এড়াতে প্রতিটি জাহাজকে যাত্রা শুরুর আগে নির্ধারিত রুট ও সময়সূচীর জন্য কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করতে হবে। এই নিয়ম অমান্য করলে তার পূর্ণ দায়ভার জাহাজের মালিকের ওপর বর্তাবে।

চুক্তির কয়েক ঘণ্টাতেই ৬০ লাখ ব্যারেল তেল পার!

চুক্তিটি যে কতটা প্রভাবশালী, তার প্রমাণ মিলেছে সই হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। ওভাল অফিস আর তেহরানের সবুজ সংকেত পাওয়ার পরপরই তিনটি বিশাল সৌদি ট্যাংকারসহ বেশ কয়েকটি আটকে থাকা জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়ে যায়। এই ট্যাংকারগুলোতে ছিল প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল, যা বিশ্ববাজারের বড় ঘাটতি মেটাতে যাচ্ছে।

ধস নামল তেলের বাজারে, মার্চের পর সর্বনিম্ন!

হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল হওয়ার খবরে বিশ্বজুড়ে তেলের সরবরাহ বাড়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আর এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ববাজারে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্টের অপরিশোধিত তেলের দাম ৪৩ সেন্ট কমে প্রতি ব্যারেল ৭৯.৪২ ডলারে নেমে এসেছে।

Layout পরিবর্তনের পাশাপাশি মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দাম ১৭ সেন্ট কমে প্রতি ব্যারেল দাঁড়িয়েছে ৭৬.৪৩ ডলারে। তেলের এই দাম গত মার্চের পর সর্বনিম্ন!

শান্তি চুক্তি কি টিকবে? তেলের বাজারের আড়ালে বড় সংশয়

তেলের দাম কমায় আমদানিকারক দেশগুলো স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও পর্দার আড়ালের ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি কিন্তু এখনো কাটেনি। বাজার বিশ্লেষকদের কপালে এখনো চিন্তার ভাঁজ।

এর পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ রয়েছে:

১. লেবানন সংকট: লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখনো অব্যাহত। হিজবুল্লাহর পেছনে ইরানের সরাসরি সমর্থন থাকায় এই সংঘাত যেকোনো সময় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে ভেস্তে দিতে পারে।

২. জে ডি ভ্যান্সের আকস্মিক সিদ্ধান্ত: সুইজারল্যান্ডে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি পূর্বনির্ধারিত বৈঠক থেকে শেষ মুহূর্তে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। আমেরিকার এই শীর্ষ নেতার এমন সিদ্ধান্ত চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

তেল বাজার বিশ্লেষণকারী বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘ভান্দা ইনসাইটস’-এর প্রতিষ্ঠাতা বন্দনা হরি বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে স্পষ্ট বলেছেন, “বর্তমান যে জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তা হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ যাতায়াতের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারছে না।”

আপাতত যুদ্ধ থামায় বিশ্ব স্বস্তি পেলেও, হরমুজের জলরাশিতে শান্তির এই হাওয়া কতদিন স্থায়ী হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

এনএন/ ২০ জুন ২০২৬



Scroll to Top