দুবাই থেকে ঢাকা: বেনজীরকে প্রত্যর্পণের পথে আইনি ও কূটনৈতিক বাধা | চ্যানেল আই অনলাইন

দুবাই থেকে ঢাকা: বেনজীরকে প্রত্যর্পণের পথে আইনি ও কূটনৈতিক বাধা | চ্যানেল আই অনলাইন

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। তবে এই পথ মোটেও সহজ নয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশকে ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ প্রত্যর্পণ আবেদন জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন আইনি যাচাই, আদালতের অনুমোদন এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সমন্বয়সহ একাধিক ধাপ পেরিয়েই নির্ধারিত হবে বেনজীর আহমেদকে কত দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশের এনসিবি ঢাকা শাখায় পাঠানো আনুষ্ঠানিক চিঠিতে বলা হয়েছে, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ সরকারকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন জমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন না করা হলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের পর বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিচারিক কর্তৃপক্ষের সামনে হাজির করা হয়। এ সময় আদালত দেশটির ‘ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬’-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার ভিত্তিতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ (নং-A-5174/4-2025) অনুসারে বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন তাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তরের জন্য কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাতে হবে।

আমিরাতের আইন অনুযায়ী, প্রত্যর্পণ আবেদনপত্রের সঙ্গে সব প্রয়োজনীয় নথি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে যথাযথ স্বাক্ষর ও সিলমোহরসহ জমা দিতে হবে। প্রয়োজনীয় নথির মধ্যে রয়েছে অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় ও জাতীয়তার তথ্য, সংশ্লিষ্ট অপরাধের আইনগত বিবরণ ও শাস্তির বিধান, আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি এবং সাজাপ্রাপ্ত হলে আদালতের রায়ের কপি।

বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি ও বিদেশে গ্রেপ্তার হওয়ার পরও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং জটিল হতে পারে।

ইন্টারপোলের ওয়েবসাইট অনুযায়ী, বর্তমানে রেড নোটিশের তালিকায় ৫৯ জন বাংলাদেশির নাম রয়েছে। এ তালিকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী, হত্যা মামলার আসামি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার পলাতক দণ্ডিতসহ বিভিন্ন মামলার অভিযুক্তরা রয়েছেন। তবে তাদের অধিকাংশকেই এখন পর্যন্ত দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে গত বছরের ১০ এপ্রিল ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করে। সরকারের উদ্যোগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রচেষ্টার ফলে তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তবে গ্রেপ্তারের পরই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার মূল চ্যালেঞ্জ শুরু হয়।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, বেনজীরকে ফেরানোর প্রক্রিয়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলে পরিচালিত হবে। এর পাশাপাশি আদালতের অনুমোদন এবং বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করতে হবে। ফলে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও তা দ্রুত হবে না।

পুলিশ সদর দপ্তরে অবস্থিত ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আন্তর্জাতিক অপরাধী ও পলাতক ব্যক্তিদের তথ্য আদান-প্রদান এবং গ্রেপ্তার সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে। এনসিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বেনজীর আহমেদের প্রত্যর্পণের ক্ষেত্রে অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা অতিক্রম করতে হবে— মামলার প্রকৃতি, বিচারিক চ্যালেঞ্জ, আদালতের অনুমোদন এবং কূটনৈতিক সমন্বয়।

প্রথমত, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত যাচাই করবে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো উভয় দেশের আইনেই অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত কি না। আন্তর্জাতিক আইনে এটি ‘ডুয়াল ক্রিমিন্যালিটি’ নীতি হিসেবে পরিচিত। দুর্নীতি, অর্থ পাচার, জালিয়াতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো অভিযোগ সাধারণত এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে থাকে।

তবে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় নতুন জটিলতাও তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার মতে, বেনজীর আহমেদের আইনজীবীরা আদালতে দাবি করতে পারেন যে মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অথবা বিচার প্রক্রিয়ায় ত্রুটি রয়েছে। এমন যুক্তি উত্থাপিত হলে বিষয়টি আদালতের বিস্তারিত পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক (মিডিয়া) আকতারুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ১৪ কোটি ৬২ লাখ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং বিচার চলছে। বাকি পাঁচটি মামলায় প্রায় ৭৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় বেনজীর আহমেদ জালিয়াতির মাধ্যমে একাধিক বেসরকারি পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।

দুদকের দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে জারি হওয়া ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে রোববার দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ। জানা গেছে, লন্ডন থেকে এশিয়ার একটি দেশের উদ্দেশে যাত্রাকালে দুবাইয়ে ট্রানজিটের সময় তাকে আটক করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং দুই দেশের কূটনৈতিক সমন্বয়ের ওপরই নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত বেনজীর আহমেদকে কত দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

গত বছর বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন এবং অর্থনৈতিক অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। তদন্তের অংশ হিসেবে আদালতের নির্দেশে তাদের নামে থাকা বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, কোম্পানির শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র জব্দ বা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আদালতের নির্দেশে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র‍্যাবের মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার ছিলেন।

Scroll to Top