বিশ্বফুটবলের মহোৎসব ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর পর্দা উঠতে যাচ্ছে কয়েকঘণ্টা পর। প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের এই বিশাল আসরে প্রতিটি গ্রুপের বিন্যাসই ছড়াচ্ছে টানটান উত্তেজনা। ব্যতিক্রম নয় ‘গ্রুপ-জি’ও। চার ভিন্ন মহাদেশের- ইউরোপের পরাশক্তি বেলজিয়াম, আফ্রিকার সিংহ মিশর, এশিয়ার লড়াকু দল ইরান এবং ওশেনিয়ার প্রতিনিধি নিউজিল্যান্ডের উপস্থিতিতে এই গ্রুপটি জমজমাট। অবশ্য নকআউটের দৌড়ে বেলজিয়াম এগিয়ে থাকলেও লড়াইটা মূলত মিশর ও ইরানের।
কাগজে-কলমে এবং শক্তিমত্তায় এই গ্রুপে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবে বেলজিয়াম। কেভিন ডি ব্রুইনা এবং রোমেলু লুকাকু জুটিতে নিজেদের প্রথম শিরোপার লক্ষ্যে তারা। মোহাম্মেদ সালাহর নেতৃত্বে মিশরের লক্ষ্যটা গ্রুপপর্ব পেরিয়ে নকআউটে খেলা। অন্যদিকে অনিশ্চয়তা ও যুদ্ধাবস্থা কাটিয়ে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছেছে ইরান। তাদের লক্ষ্যটাও প্রথমবার গ্রুপপর্ব পেরুনো। আর এই গ্রুপে আলোচনায় না থাকলেও ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি নিউজিল্যান্ড হতে পারে ডার্ক হর্স। যেকোনো দলের পয়েন্ট কেড়ে নেয়া হয়তো তাদের লক্ষ্য। শক্তিমত্তা ও ইতিহাসের বিচারে কে কতটা এগিয়ে, চলুন দেখে নেওয়া যাক চ্যানেল আই অনলাইনের বিশ্লেষণ এক নজরে।
ফিফার সবশেষ প্রকাশিত র্যাঙ্কিংয়ে ‘এফ’ গ্রুপে সবার চেয়ে এগিয়ে বেলজিয়াম। ৯ নম্বরে আছে তারা। এরপরই অবস্থান ইরানের, র্যাঙ্কিংয়ে ২০ নম্বরে দেশটি। ২৯ নম্বরে থাকা মিশর আছে তৃতীয় স্থানে। সবার শেষে অবস্থান করা নিউজিল্যান্ড ফিফা র্যাঙ্কিং ৮৫তম।
বেলজিয়াম
বিশ্বকাপের মঞ্চে বরাবরের মতোই ফেভারিটের তালিকায় থাকে বেলজিয়াম। তবে তাদের গোল্ডেন জেনারেশন-এর জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপটি হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের প্রমাণের শেষ সুযোগ।
বেলজিয়ামের বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেরা সাফল্য এসেছিল ২০১৮ সালে, সে আসরে তারা তৃতীয় স্থান অর্জন করেছিল। তবে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিয়েছিল। ১৫তম বিশ্বকাপ আসরে নেমে সেই হতাশা ভুলে এবার ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া তারা।
অভিজ্ঞতার দিক থেকে গ্রুপে সবচেয়ে এগিয়ে বেলজিয়াম। দলে রয়েছেন বিশ্বমানের মিডফিল্ডার কেভিন ডি ব্রুইনা এবং ফরোয়ার্ড রোমেলু লুকাকু। এছাড়া গোলবারের নিচে থিবো কোর্ত্তয়ার উপস্থিতি দলকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস যোগায়। তরুণ ও অভিজ্ঞদের মিশ্রণে গড়া এই স্কোয়াড শেষচারের অন্যতম দাবিদার।
ইরান
ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে যখন ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরু হয়েছে, তখন থেকেই অনিশ্চয়তা শুরু হয়েছিল ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ইরান ফুটবল দল বিশ্বকাপ খেলবে যুক্তরাষ্ট্রের মাঠেই।
ইরান এ পর্যন্ত ৭ বার বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। তবে তাদের বড় আক্ষেপ-এখনো পর্যন্ত তারা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের বাধা পার হতে পারেনি। নানা বাধা কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসা দলটি চাইবে এবার সেই বাধা কাটাতে।
মিশর
১৯৩৪ সালে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে তারা শেষ ষোলো-তে খেলেছিল, যা এখন পর্যন্ত তাদের সেরা সাফল্য। এরপর ১৯৯০ এবং ২০১৮ সালের আসরে তারা গ্রুপপর্ব থেকেই বিদায় নেয়। এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের চতুর্থ আসরে নেমে গ্রুপপর্বের গণ্ডি পেরোতে দারুণ আশাবাদী তারা। আফ্রিকার এই পরাশক্তি যেকোনো বড় দলের জন্য ত্রাস সৃষ্টি করতে সক্ষম।
মিশরের শক্তির মূল চালিকাশক্তি তাদের আক্রমণভাগ। দলের প্রাণভোমরা লিভারপুল তারকা মোহাম্মেদ সালাহ। সালাহর সাথে যোগ হয়েছেন দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ম্যানচেস্টার সিটির স্ট্রাইকার ওমর মারমুশ। এই জুটির গতি এবং ফিনিশিং দক্ষতা যেকোনো রক্ষণভাগ চূর্ণ করতে পারে। মিশর মূলত কাউন্টার-অ্যাটাকিং বা প্রতি-আক্রমণনির্ভর ফুটবল খেলে থাকে। রক্ষণভাগ নিরেট রেখে সালাহ ও মারমুশের গতিকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে ফায়দা তুলতে পারলেই এগিয়ে থাকবে নকআউটের দৌড়ে।
নিউজিল্যান্ড
ওশেনিয়া অঞ্চল থেকে সরাসরি টিকিট কেটে বিশ্বকাপে এসেছে নিউজিল্যান্ড। গ্রুপে আন্ডারডগ হলেও তারা চমক দেখাতে পারে। নিউজিল্যান্ডের ৩য় বিশ্বকাপ আসর এটি। এর আগে ১৯৮২ এবং ২০১০ সালে তারা মূলপর্বে খেলেছিল। বিশেষ করে ২০১০ বিশ্বকাপে তারা গ্রুপপর্বে কোনো ম্যাচ না হেরেও (ড্র করে) বিদায় নিয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের হারানোর কিছু নেই, আর এই ‘কিছুই হারানোর নেই’ মানসিকতাই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। গ্রুপপর্বে যেকারো পয়েন্ট আটকানোই হতে পারে তাদের বড় অর্জন।
শক্তিমত্তার বিচারে এই গ্রুপ থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরের রাউন্ডে যাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বেলজিয়াম। দ্বিতীয় স্থানের জন্য হবে মরণপণ লড়াই। গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসেবে নকআউট পর্বে যাওয়ার মূল লড়াইটি হবে মিশর এবং ইরানের মধ্যে। সালাহর মিশর তাদের আক্রমণভাগের জোরে এগিয়ে থাকতে চাইবে, অন্যদিকে ইরানের ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকস মিশরকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলবে। নিউজিল্যান্ডকে খাতা-কলমে পিছিয়ে রাখা হলেও তারা যদি ইরান বা মিশরের কাছ থেকে পয়েন্ট ছিনিয়ে নিতে পারে, তবে পুরো গ্রুপের সমীকরণ ওলটপালট হয়ে যাবে।




