একটা জাতির চিন্ত শক্তি কতটা হারিয়ে ফেলেছে তা বোঝার জন্য জটিল অর্থনৈতিক মডেল বোঝার প্রয়োজন হয় না, জ্ঞান-বিজ্ঞানের শিখা প্রশাখায় অবাধ বিচরণের প্রয়োজনও পড়ে না। প্রয়োজন শুধু সাম্প্রতিক খবরের শিরোনামগুলোতে চোখ রাখার। যা মূলত দেশের গতিবিধি নির্দেশ করে।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো অবলোকন করলে দেখাযায় কখনো আমরা ব্যস্ত থাকি ‘একটি ছাগলকে ঘিরে’ তৈরি হওয়া নাটকীয়তায়, কখনো আবার একটি মহিষের নামকরণের গভীর রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক রহস্য উন্মোচনে। মাঝখানে হারিয়ে যায় চিকিৎসাহীন শত শত শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালের সংকট, শিক্ষা ব্যবস্থার ভাঙন, অনিরাপদ সড়ক যোগাযোগে মৃত্যুর মছিলি, কর্মসংস্থানের চাপ কিংবা জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয়। প্রশ্ন হলো এগুলো কি সত্যিই আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার, নাকি আমরা ইচ্ছাকৃতভাবেই গৌণ বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে একটা বিকল্প বাস্তবতার অবগুণ্ঠন তৈরি করে ফেলেছি?
যখন একটি ছাগল বা একটি মহিষ রাষ্ট্রীয় আলোচনার কেন্দ্র্রে চলে আসে, তখন সমস্যা পশুটিতে নয় সমস্যা আমাদের মনোযোগের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে, গণমাধ্যমের দেওউলিয়াত্বে। কারা ঠিক করছে আমরা কী নিয়ে কথা বলব? কারা ঠিক করছে আমরা কী ভুলে যাব? কারণ খুব সুবিধাজনকভাবেই দেখা যায় যে সময়টা একটি ‘ভাইরাল প্রাণী কাহিনি’ দখল কওে নেয়, ঠিক সেই সময়েই কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যর্থতা, কোনো জবাবদিহির প্রশ্ন বা কোনো নীতিগত বিপর্যয় আড়ালে চলে যায়।
এটা কি কাকতাল? নাকি একটি সুপরিচিত সামাজিক ব্যবস্থাপনার ফল, যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ঘুরিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর বিভ্রান্ত কৌশল? আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই খেলায় আমরা সবাই অংশ নিই। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নীতিনির্ধারক থেকে সাধারণ নাগরিক সবাই মিলে ‘ভাইরাল অগ্রাধিকারের’ এই সার্কাসে হাততালি দিই।
ফলাফল খুব পরিষ্কার, বাস্তব সমস্যা যত জটিল হয়, আলোচনার বিষয় তত সরল হয়ে যায়। কাঠামোগত ব্যর্থতা যত গভীর হয়, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু তত বেশি প্রতীকী এবং হাস্যকর হয়ে ওঠে। একটি রাষ্ট্র তখনই বিপদে পড়ে না যখন সমস্যা থাকে; রাষ্ট্র তখনই বিপদে পড়ে যখন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার জায়গাটা বিনোদন, ব্যঙ্গ আর অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনায় ভরে যায়।
ছাগল বা মহিষ কোনো সংকট নয়। সংকট হলো আমরা ধীরে ধীরে এমন এক মানসিক অভ্যাস তৈরি করছি যেখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো ক্লান্তিকর মনে হয়, আর তুচ্ছ ঘটনাগুলো ‘জাতীয় ইস্যু’ হয়ে ওঠে। যেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশ প্রতক্ষ্যভাবে জড়িত হয়, বিষয়টিকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকীকরণ করতে গিয়ে আারও ঠুন্ক হাস্যকর হিসেবে উপস্থাপণ করে।
এভাবে চলতে থাকলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে নীরব এক জায়গায়, আমাদের বিবেচনাশক্তিতে। তখন আমরা আর বুঝব না কোনটা শিরোনাম হওয়া উচিত, আর কোনটা শুধু শব্দমাত্র। কোনটা দর্শণ আর কোনটা দৃষ্টি; কোনটা শুদ্ধ আর কোনটা ভ্রম। রাষ্ট্র তখন আর বাস্তব সমস্যার জায়গা থাকবে না হয়ে যাবে একটি কৌতুকের ক্যালেন্ডার, যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন ‘প্রাণী-নাটক’ আমাদের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করবে। শেষ প্রশ্নটা তাই খুব সরল, কিন্তু অস্বস্তিকর আমরা কি এখনো নিজেরাই ঠিক করছি কী গুরুত্বপূর্ণ, নাকি কেউ সেটা আমাদের জন্য ঠিক করে দিচ্ছে?
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)




