নাথ ব্যাংক
১৯২৬ সালে নোয়াখালীতে প্রতিষ্ঠিত নাথ ব্যাংক দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্রুত আস্থা অর্জন করে। কে এন দালালের নেতৃত্বে ব্যাংকটি ছয়-সাত বছরের মধ্যেই স্থিতিশীলতা লাভ করে এবং ১৯৩২ সালে কলকাতায় শাখা খোলে। ১৯৩৬ সালে কলকাতার ১৩৫ নম্বর ক্যানিং স্ট্রিটে অবস্থিত শাখাটি প্রধান কার্যালয়ে উন্নীত হয়। তফসিলভুক্ত এই ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত ছিল এবং কলকাতা ক্লিয়ারিং ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ অর্জন করে।
১৯৩৯ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে আদায়ীকৃত মূলধন ও আমানতের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ব্যাংকটির আর্থিক সক্ষমতার পরিচায়ক। স্থায়ী আমানত, সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাব এবং ক্যাশ সার্টিফিকেট মিলিয়ে আমানতের পরিমাণ এক কোটির বেশি অতিক্রম করে। ১৯৪০ সালে নিট মুনাফা দাঁড়ায় ৮৮ হাজার টাকার বেশি। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি অংশীদারদের শতকরা সাড়ে ৭ টাকা হারে লভ্যাংশ প্রদান করে।
নূর মিয়া বনাম নোয়াখালী নাথ ব্যাংক লিমিটেড
ব্রিটিশ আমলে বাংলায় কৃষিজীবী ঋণগ্রস্ত মানুষের সুরক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছিল বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটর্স অ্যাক্ট, ১৯৩৬। এই আইনের উদ্দেশ্য ছিল ঋণের বোঝায় জর্জরিত কৃষকদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া এবং ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমে তাঁদের দেনা নিষ্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু ‘ঋণ’ বলতে ঠিক কী বোঝাবে এবং কোন দায় এই আইনের আওতায় পড়বে, সে প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয় নূর মিয়া বনাম নোয়াখালী নাথ ব্যাংক লিমিটেড মামলার।
নূর মিয়াসহ কয়েকজন নোয়াখালী নাথ ব্যাংক থেকে ধার নিয়েছিলেন। পরে আর্থিক সংকটে পড়ে তাঁরা ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডে আবেদন করেন। বোর্ড ধারা ৩৪ অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতকে নোটিশ দিয়ে জানায় যে সংশ্লিষ্ট মামলা স্থগিত রাখতে হবে। কিন্তু এর মধ্যেই নোয়াখালী নাথ ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট অনুযায়ী ‘শিডিউলড ব্যাংক’ অর্থাৎ তফসিলি ব্যাংক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। আইনে স্পষ্ট ছিল—তালিকাভুক্ত ব্যাংকের কাছে প্রদেয় দায় ‘কৃষিঋণ’ হিসেবে গণ্য হবে না।
এ অবস্থায় ব্যাংকের দাবি ছিল, যেহেতু এটি এখন শিডিউলড ব্যাংক, তাই এই দায় আর আইনের অর্থে ‘ঋণ’ নয় এবং ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের এখতিয়ারও এখানে প্রযোজ্য নয়। বিপরীতে নূর মিয়ার বক্তব্য ছিল, তিনি যখন বোর্ডে আবেদন করেছিলেন তখন ব্যাংকটি তালিকাভুক্ত ছিল না; ফলে তাঁর আবেদন বৈধ।
মামলার মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, ধারা ৩৪-এর নোটিশ পেলেই দেওয়ানি আদালত বাধ্যতামূলকভাবে মামলা স্থগিত করবেন নাকি প্রথমে নিজেই নির্ধারণ করবেন সংশ্লিষ্ট দায় আদৌ আইনের অর্থে ‘ঋণ’ কি না।
বিচারপতি ঘোষ ও বিচারপতি মুখার্জি গুরুত্বপূর্ণ এক নীতিগত সিদ্ধান্ত দেন। তাঁরা বলেন, কোনো দায় ‘ঋণ’ হিসেবে গণ্য হবে কি না, সেই প্রশ্ন নির্ধারণের ক্ষমতা ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের নয়; এটি দেওয়ানি আদালতের এখতিয়ার। বোর্ড কেবল তখনই কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, যখন প্রকৃতপক্ষে আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী একটি ‘ঋণ’ বিদ্যমান থাকে। আদালত আরও স্পষ্ট করেন, এই প্রশ্ন নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক সময় হলো আদালত যখন বিষয়টি বিবেচনা করবেন সেই সময়; বোর্ডে আবেদন দাখিলের সময় নয়।
ফলে আদালত সিদ্ধান্ত দেন, নোয়াখালী নাথ ব্যাংক যেহেতু ইতিমধ্যে শিডিউলড ব্যাংকে পরিণত হয়েছে, তাই সংশ্লিষ্ট দায় আর বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটর্স অ্যাক্টের অধীনে ‘ঋণ’ নয়। সুতরাং ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের নোটিশ আদালত মানতে বাধ্য নন এবং দেওয়ানি মামলার কার্যক্রম চলতে পারে।
এই রায় পরবর্তীকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কারণ, এটি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেয় যে বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ডেটর্স অ্যাক্টের অধীনে দেওয়ানি আদালত ও ডেট সেটেলমেন্ট বোর্ডের ক্ষমতার সীমারেখা কোথায়। বিশেষত কোনো দায় আইনের অর্থে ‘ঋণ’ কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা যে দেওয়ানি আদালতের; এই মামলা সেই নীতিকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে।
নোয়াখালী ইউনিয়ন ব্যাংক
নোয়াখালী ইউনিয়ন ব্যাংক পূর্ববঙ্গের দেশীয় ব্যাংকিং উদ্যোগের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক অতি সীমিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যেই বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। কলকাতার ১০ ক্যানিং স্ট্রিটে প্রধান কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাংকটি তৎকালীন বঙ্গদেশের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপন করে। বড়বাজার ও দক্ষিণ কলকাতার পাশাপাশি পূর্ববঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে শাখা বিস্তার করে তারা আঞ্চলিক বাণিজ্য, পুঁজি স্থানান্তর ও আমানত সংগ্রহে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। মাত্র ২৫ হাজার টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও সতীশচন্দ্র পালের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে ব্যাংকটি দ্রুত স্থিতিশীলতা অর্জন করে এবং সাধারণ ব্যবসায়ী ও আমানতকারীদের আস্থা লাভ করে।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, ঔপনিবেশিক আমলে পূর্ববঙ্গের দেশীয় ব্যাংকগুলো কেবল অর্থ লেনদেনের প্রতিষ্ঠান ছিল না; বরং তারা ছিল স্থানীয় উদ্যোগ, পুঁজি সংগঠন ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তি। বৈশ্বিক মন্দা, সীমিত মূলধন, ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও এসব ব্যাংক সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে সক্ষম হয়। উদ্ভাবনী উদ্যোগ, স্থানীয় জনগণের আস্থা ও অভিযোজনক্ষমতার ভিত্তিতে তারা আঞ্চলিক অর্থনীতিকে সচল রাখে, বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়তা করে এবং দেশীয় উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই ধারাবাহিক প্রয়াসই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকিং কাঠামোর ভিত্তি সুদৃঢ় করে এবং দেশীয় আর্থিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের জন্ম দেয়।
পূর্ববঙ্গে ব্যাংকিং: পাকিস্তান আমল
১৯৪৭ সালে দেশে অতফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ৭০৪টি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এসব ব্যাংকের গুরুত্ব দ্রুত হ্রাস পায়; ১৯৬৩ সালের মধ্যে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪৯টিতে। বিপরীতে তফসিলি ব্যাংকসমূহ পাকিস্তান আমলে ক্রমেই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালে যেখানে তফসিলি ব্যাংক ছিল মাত্র ২টি, ১৯৬৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫টিতে। শাখা বিস্তারও ছিল লক্ষণীয়। ১৯৬২ সালে সারা দেশে ব্যাংক শাখার সংখ্যা ছিল ৮৩১টি; ১৯৬৩ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয় ১ হাজার ১৩০টি। তবে এই সম্প্রসারণ ছিল ভৌগোলিকভাবে অসম, ৩৬২টি শাখা পূর্ব পাকিস্তানে এবং ৭৬৮টি পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত ছিল। এ পরিসংখ্যান ব্যাংকিং খাতে তৎকালীন আঞ্চলিক বৈষম্যের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
পূর্ব ও পশ্চিম উভয় অংশে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় দপ্তরের মোট নয়টি অফিস ছিল; এর মধ্যে তিনটি পূর্ব পাকিস্তানে এবং ছয়টি পশ্চিম পাকিস্তানে। কেন্দ্রীয় পরিদপ্তরের অধীনেই ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হতো। দেশভাগের প্রাক্কালে ১৯৪৭ সালে, পাকিস্তানভিত্তিক আধুনিক ব্যাংক ছিল কার্যত একটি, ব্যাংক অব অস্ট্রেলেশিয়া। দেশভাগের পর প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং এর পরপরই গঠিত হয় ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট করাচিতে স্টেট ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয়। ১৯৭০ সালের মধ্যে পাকিস্তানে তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬টিতে। এর মধ্যে ১৩টি ব্যাংক পূর্ব পাকিস্তানে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও, মাত্র ১টি ছিল সম্পূর্ণ বাঙালি মালিকানাধীন এবং আরেকটি আংশিক বাঙালি মালিকানায় পরিচালিত।
১৯৬২ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাবিব ব্যাংক লিমিটেড ও মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের একাধিক শাখা ঢাকায় কার্যরত ছিল। হাবিব ব্যাংকের শাখা ছিল নবাবপুর রোড, তেজগাঁও, মৌলভীবাজার, সদরঘাট ও রমনায়। অন্যদিকে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংকের শাখা ছিল মিটফোর্ড রোড, জনসন রোড, নিউমার্কেট ও রমনায়। তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক যুগ পরেও পূর্ব পাকিস্তানভিত্তিক শক্তিশালী আধুনিক ব্যাংক গড়ে না ওঠায় জনমনে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। পুঁজির স্বল্পতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে পূর্ব পাকিস্তানের উদ্যোক্তারা দীর্ঘ সময় ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেননি। তবে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে বাঙালিদের প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ ও দৃশ্যমান অংশগ্রহণ শুরু হয়। এটি ছিল বাঙালি ও অবাঙালি উদ্যোক্তার যৌথ উদ্যোগ। ১১ মে ১৯৫৯ চট্টগ্রামে প্রধান কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে ব্যাংকটি কার্যক্রম শুরু করে।
সরকারি সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ও আর নিজাম (গ্রাহামস ট্রেডিং কোম্পানি), এম আর সিদ্দিকী (এ কে খান অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড), খান বাহাদুর মুজিবুর রহমান, মির্জা মোহাম্মদ আলী ইস্পাহানী, হাবিবুর রহমান এবং এ এইচ খান। ব্যাংকটির অনুমোদিত মূলধন ছিল ৫০ লক্ষ টাকা। ১৯৬০-এর দশকের গোড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড। হাবিব ব্যাংক থেকে বেরিয়ে এসে আগা হাসান আবেদী এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের মাধ্যমে তিনি পূর্বাঞ্চলে ব্যাংকটির অবস্থান সুদৃঢ় করেন। গ্রামাঞ্চলে শাখা বিস্তারের পাশাপাশি ঢাকাতেই ইউনাইটেড ব্যাংকের চারটি শাখা সক্রিয় ছিল। পাকিস্তান আমলে ব্যাংকিং খাতে পরিমাণগত সম্প্রসারণ ঘটলেও মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও মূলধনের ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান ছিল সুস্পষ্টভাবে বঞ্চিত। এ বৈষম্য পরবর্তী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম পটভূমি রচনা করে।
১৯৬৫ সালের ২৮ জানুয়ারি সম্পূর্ণ বাঙালি মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন। সরকারের কোনো পুঁজি বিনিয়োগ ছাড়াই ঢাকাকে প্রধান কার্যালয় করে যাত্রা শুরু করা এই ব্যাংকের প্রারম্ভিক পরিশোধিত মূলধন ছিল ১৪ লাখ ২১ হাজার টাকা। নাথ ব্যাংক ও এর শাখাসমূহের সম্পদ ও দায়দায়িত্ব অধিগ্রহণের মাধ্যমে ব্যাংকটি দ্রুত কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। এর প্রধান উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলাম, সাবেক চিফ ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার ও ক্যাপ্টেন জগদীশ দেবনাথ।
ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক এবং ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের কার্যক্রম প্রধানত পূর্ব পাকিস্তানকেন্দ্রিক ছিল। বৃহৎ পাকিস্তানি ব্যাংকগুলোর তুলনায় আকার ও সম্পদ সীমিত হলেও স্থানীয় অর্থনীতিতে তাদের প্রভাব ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের শাখা ছিল ২১টি এবং ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনের ৫৮টি। তৎকালীন ঢাকায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানও কার্যক্রম পরিচালনা করত, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং অ্যাগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব পাকিস্তান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এরা যথাক্রমে বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ঢাকায় পাঁচটি বিদেশি ব্যাংকও সক্রিয় ছিল।
উপসংহার
স্বাধীনতার পর নবগঠিত রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান পদক্ষেপ ছিল ব্যাংকিং খাতের পুনর্বিন্যাস ও জাতীয়করণ। বাঙালি মালিকানাধীন দুই ব্যাংকসহ পাকিস্তানি মালিকানাধীন মোট ১০টি বাণিজ্যিক ব্যাংক জাতীয়করণ হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সাময়িকভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব গ্রহণ করে; পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর ৩ কোটি টাকার সম্পূর্ণ সরকারি পরিশোধিত মূলধন নিয়ে এটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়। এর পরপরই একাধিক পাকিস্তানি ব্যাংকের সম্পদ ও দায় একীভূত করে নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক গঠন করা হয়। হাবিব ব্যাংক লিমিটেড ও কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের সম্পদ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় অগ্রণী ব্যাংক। ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান, ব্যাংক অব ভাওয়ালপুর ও প্রিমিয়ার ব্যাংক একীভূত হয়ে গড়ে ওঠে সোনালী ব্যাংক। ইউনাইটেড ব্যাংক লিমিটেড ও ইউনিয়ন ব্যাংকের সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় জনতা ব্যাংক। মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, অস্ট্রেলেশিয়া ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সম্পদ ও দায় একীভূত করে গঠিত হয় রূপালী ব্যাংক। জাতীয়করণের ফলে ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক রূপ নেয় পূবালী ব্যাংকে এবং ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন পরিণত হয় উত্তরা ব্যাংকে।
পূর্ববঙ্গের উপরিউক্ত ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ থেকে এই উপসংহারে উপনীত হওয়া যায় যে ঔপনিবেশিক শাসন, বৈশ্বিক মন্দা ও আঞ্চলিক বৈষম্যের প্রতিকূল পরিবেশেও দেশীয় উদ্যোক্তারা ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রয়াস থামাননি। নিখিল বঙ্গ ব্যাংক সংঘের মতো সংগঠন স্থানীয় আর্থিক শক্তিকে সংগঠিত ও সমন্বিত করেছিল। কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠা দেশীয় ব্যাংকগুলো কেবল ঋণদানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তারা ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোদ্যোগ ও আঞ্চলিক পুঁজির সঞ্চালনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এই দীর্ঘ উত্থান-পতন, রূপান্তর ও পুনর্গঠনের ধারাই স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং কাঠামো নির্মাণে ভিত্তি জুগিয়েছে। আধুনিক এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংকব্যবস্থা দেশীয় উদ্যোগ, ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ও স্বাধীন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের সম্মিলিত ফসল। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেবল লেনদেনের কাঠামো নয়; বরং তা একটি জাতির অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার সংগঠিত প্রকাশ।



