বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, রাষ্ট্রগঠন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি—এসব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের নাম।
তার রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং হত্যাকাণ্ড ঘিরে নানা প্রশ্ন নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন।
অধ্যাপক মামুনের মতে, স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি মনে করেন, জিয়া বেঁচে থাকলে দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা আরও ভিন্ন ও উন্নত হতে পারত।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে নেতৃত্ব
অধ্যাপক মামুন বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে দেশের মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। সেই সংকটময় সময়ে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেওয়ার আহ্বান মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল জোগায়।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে বাঙালি জাতি একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা পায় এবং মুক্তিযুদ্ধ দ্রুত সংগঠিত প্রতিরোধে রূপ নেয়। শুধু ঘোষণাই নয়, সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণেও জিয়ার অবদান গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় উত্থান
মুক্তিযুদ্ধ শেষে সেনাবাহিনীতে ফিরে এসে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন জিয়াউর রহমান। ডেপুটি চিফ থেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত হওয়া এবং বীর উত্তম খেতাব অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সৃষ্ট অস্থিরতার মধ্যে তিনি জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। অধ্যাপক মামুনের মতে, সেনাবাহিনীতে তাঁর জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্বগুণ তাঁকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যায়।
বহুদলীয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পুনর্গঠন
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনীতি পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ নেন বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মামুন। তার মতে, একদলীয় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বৃদ্ধি এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে।
তিনি আরও বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণেও জিয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ, শিশু একাডেমি, জাতীয় শিশু পার্কসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগ সেই সময়ের উল্লেখযোগ্য অর্জন
অধ্যাপক মামুনের মতে, জিয়াউর রহমানের সময় কৃষি, শিল্প ও গ্রামীণ উন্নয়নকে কেন্দ্র করে একটি সুসংহত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা হয়।
তিনি বলেন, খাল খনন কর্মসূচি, ১৯ দফা কর্মসূচি, পল্লী উন্নয়ন উদ্যোগ এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা দেশের অর্থনীতিকে নতুন গতি দেয়। একই সময়ে শিল্পায়নের ওপর জোর দেওয়া হয় এবং হাজারো নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে।
গার্মেন্টস শিল্পের সূচনা এবং বিদেশে শ্রমশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে রেমিট্যান্স অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপনের বিষয়টিকেও তিনি জিয়ার সময়ের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির রূপকার
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসরকে বিস্তৃত করেন বলে মনে করেন অধ্যাপক মামুন। তার মতে, মধ্যপ্রাচ্য, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে বাংলাদেশকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ, যা পরবর্তীতে সার্ক প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে, সেটিকেও তিনি জিয়ার দূরদর্শী কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেন।

কেন হত্যা করা হয়েছিল জিয়াউর রহমানকে?
জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা মত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক মামুন। তাঁর মতে, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, পদোন্নতি ও ক্ষমতার প্রশ্ন, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা এই ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তিনি মনে করেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে জিয়ার নেতৃত্বে যে রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও বাংলাদেশপন্থী রাজনৈতিক ধারা গড়ে উঠছিল, সেটিকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মঞ্জুর বিদ্রোহ ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত বিদ্রোহ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মামুন বলেন, জিয়াউর রহমান হত্যার পর সেনাবাহিনীর একটি অংশ ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করেছিল বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
তাঁর মতে, সেনাবাহিনীর বড় অংশ জিয়ার প্রতি অনুগত থাকায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
বিচার নিয়ে এখনো প্রশ্ন
জিয়াউর রহমান হত্যার বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক মামুন। তাঁর মতে, ঘটনার তদন্তে গঠিত বিভিন্ন কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনো জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়নি।
তিনি বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং এর পেছনে কারা জড়িত ছিল তা জানতে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঘটনার নেপথ্যের সব কুশীলবকে আইনের আওতায় আনা উচিত।”
‘জিয়া বেঁচে থাকলে দেশ আরও এগোতে পারত’
সাক্ষাৎকারের শেষাংশে অধ্যাপক মামুন বলেন, “জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, সেনাপ্রধান এবং রাষ্ট্রপতি—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক জনপ্রিয় রাষ্ট্রনায়ক। তিনি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রযাত্রা আরও ভিন্ন মাত্রা পেতে পারত।”
তিনি মনে করেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।




