চার দিনের সফরে ভারতে পৌঁছেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী | চ্যানেল আই অনলাইন

চার দিনের সফরে ভারতে পৌঁছেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী | চ্যানেল আই অনলাইন

ইরান যুদ্ধের জেরে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে চার দিনের সফরে শনিবার (২৩ মে) ভারতে পৌঁছেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভারতকে আরও বেশি মার্কিন জ্বালানি রপ্তানি।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

শনিবার স্থানীয় সময় সকালে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় শহর কলকাতা পৌঁছান রুবিও। সফরসূচিতে রয়েছে নয়াদিল্লি, জয়পুর এবং আগ্রা সফরও। এ সময় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী হয়ে জ্বালানি পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ায় ভারত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি উত্তেজনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। শান্তি আলোচনা নিয়ে চাপ সৃষ্টি করতে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখাকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে।

ভারত তার জ্বালানির চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে। প্রায় ১৪০ কোটির বেশি মানুষের দেশটি রান্নার গ্যাস, জ্বালানি তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের জন্য বহুলাংশে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ভারত।

এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কাছে আরও বেশি জ্বালানি বিক্রির আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রুবিও বলেন, ভারত যতটুকু কিনতে চায়, আমরা ততটুকুই জ্বালানি বিক্রি করতে চাই। বর্তমানে মার্কিন উৎপাদন ও রপ্তানি ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, দিল্লিও যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়াতে আগ্রহী হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ভারসাম্য ঘাটতি কমানোর সুযোগ তৈরি হবে যা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষের কারণ ছিল। ২০২৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৫৮ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ২৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে জ্বালানি আনা তুলনামূলক ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি রুটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান ঘাটতি পূরণে শুধু মার্কিন জ্বালানির ওপর নির্ভর করা বাস্তবসম্মত নয়।

দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক অধ্যাপক ভিনীত প্রকাশ বলেন, “ইরান পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই এ সফরের মূল বিষয় হবে জ্বালানি নিরাপত্তা।” তিনি বলেন, রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতকে আগেই ছাড় দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তবে দিল্লি আরও সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারে।

রুবিওর সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ওয়াশিংটন ও দিল্লির মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা এবং গত বছরের ভারত-পাকিস্তান সীমিত সংঘাত কে থামিয়েছে এ নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন, তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন। তবে ভারত বরাবরই এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতার বিরোধিতা করেছে।

ভারতের অসন্তোষের আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসীম মুনিরের প্রতি ট্রাম্পের প্রকাশ্য প্রশংসা। ট্রাম্প তাকে নিজের প্রিয় ফিল্ড মার্শাল বলেও উল্লেখ করেছিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টায় পাকিস্তানের ভূমিকার কারণে ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

তবে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, রুবিওর এ সফরে পাকিস্তান নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি মন্তব্য আসবে না। বরং দিল্লির নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি অন্তরালেই আলোচিত হতে পারে।

এদিকে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাণিজ্য নিয়েও দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের ওপর আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক ৫০ শতাংশ থেকে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতের এক রায়ের পর তা আরও কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়, যা ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য স্বস্তি তৈরি করেছে।

এর বিনিময়ে গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির আওতায় জ্বালানি, উড়োজাহাজ, প্রযুক্তি ও কৃষিপণ্যসহ ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেয় ভারত। বর্তমানে আরও বিস্তৃত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে, যদিও বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের আরেক গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে কুয়াড জোট। ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানকে নিয়ে গঠিত এ জোটকে ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের প্রভাব মোকাবিলার সম্ভাব্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখা হয়। ২৬ মে দিল্লিতে কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নেবেন রুবিও। বছরের শেষ দিকে নেতাদের শীর্ষ সম্মেলনও হওয়ার কথা রয়েছে, যদিও সেখানে ট্রাম্প অংশ নেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

একই সময়ে ভারত সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনেরও আয়োজন করতে যাচ্ছে। যেখানে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা অংশ নেবেন। ফলে চীনকে ঘিরে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বহুমুখী কূটনৈতিক অবস্থান নেওয়া দুই দিক থেকেই রুবিওর এই সফর ভারতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Scroll to Top