রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তার লামকে নৃশংসভাবে হত্যা করা পাশের ফ্ল্যাটের দম্পতি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণ চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটিকে ধর্ষণের পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়েছে।
আজ বুধবার (২০ মে) সকালে সোহেল রানা ও স্বপ্নাকে পল্লবী থানা আদালতে পাঠানো হয়।
গতকাল রাতে এ ঘটনায় তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় সোহেল রানা (৩৪) ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে (২৬) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রাতেই পরিবারের পক্ষ থেকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন হত্যা মামলা করা হয়েছে।
স্বপ্নাকে গ্রেপ্তারের পর বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, সোহেল বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন একজন লোক এবং তিনি তার স্ত্রীকেও বিভিন্ন সময় নির্যাতন করতেন।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার (১৯ মে) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর–১১ নম্বর সেকশনের একটি বাড়ির পাশের ফ্ল্যাট থেকে রামিসার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটির মাথা শৌচাগারে এবং শরীরের মূল অংশ খাটের নিচ থেকে পাওয়া যায়।
পরে রাত সোয়া ১০টার দিকে পল্লবী থানায় প্রেস ব্রিফিংয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, সকালে শিশুটির মা তাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খুঁজতে থাকেন। দরজার বাইরে একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখে তিনি সন্দেহ করেন এবং পাশের ফ্ল্যাটে যান। দীর্ঘ সময় ডাকাডাকির পর দরজা খোলা হলে স্বপ্না আক্তারকে পাওয়া যায়, তবে সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান।
পুলিশের ধারণা, হত্যার পর মরদেহ গুমের উদ্দেশ্যে খণ্ডিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শিশুটির মায়ের উপস্থিতির কারণে পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করতে পারেনি আসামিরা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার ও আলামত সংগ্রহ করে।
পুলিশ জানায়, সোহেল রানাকে সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি ও তার স্ত্রী নওগাঁর সিংড়ার বাসিন্দা। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সোহেল রানার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পূর্বের একটি মামলা রয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানায়, ভিকটিমের সঙ্গে যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চিত করতে আলামত সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার স্বপ্না আক্তার দাবি করেছেন, তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন এবং ঘটনার বিষয়ে কিছু জানেন না। তবে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, দরজা না খোলা এবং মূল আসামির পালাতে সহযোগিতা করার মাধ্যমে তিনি অপরাধে সহায়তা করেছেন।
নিহত রামিসা স্থানীয় একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। তার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। পরিবারটি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছে। এ ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের অপরাধের পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করতে পারে— বিকৃত যৌন মানসিকতা, মাদকাসক্তি বা সহিংস আচরণের ইতিহাস, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক অসুস্থতা, অপরাধের পর দ্রুত প্রমাণ গোপনের চেষ্টা ও শিশুদের সহজ টার্গেট হিসেবে দেখা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক পরিবার এখনো ‘পরিচিত মানুষ নিরাপদ’ এই ধারণা থেকে বের হতে পারেনি। অথচ অধিকাংশ শিশু নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি ভিকটিমের পরিচিত কেউ হয়ে থাকে।
শিশু রামিসা আক্তারের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দোষীদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সমাজের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। বিষয়টি নিয়ে অনেকে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।





