‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময় পার করছে, যেখানে সংকট শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন মানুষের মানসিকতা, বাজারের আচরণ এবং রাষ্ট্রের প্রতি আস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে গেছে। কয়েক বছর আগেও যে অর্থনীতিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে তুলে ধরা হতো, সেই অর্থনীতিই এখন মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং অস্থিরতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট এবং রাজস্ব ঘাটতির চাপের মধ্যে হাঁটছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান সমস্যাগুলোর আড়ালে আরও গভীর একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে—রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী, ব্যাংক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাসের দুর্বলতা।’
ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও শিল্পোদ্যোক্তা আব্দুল হাই সরকার এমনটাই মনে করেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মূল জায়গাটি এখানেই। তার ভাষায়, অর্থনীতির বড় সমস্যা অর্থের সংকট নয়; বরং আস্থার সংকট।
এই বক্তব্য কেবল একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণ নয়; বরং বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ অর্থনীতি কেবল নীতিপত্র, বাজেট বা ব্যাংক ঋণের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না। অর্থনীতি চলে মানুষের প্রত্যাশা, ব্যবসায়িক সাহস, বিনিয়োগকারীর আত্মবিশ্বাস এবং বাজারের স্থিতিশীলতার উপর। যখন উদ্যোক্তা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন, ব্যাংক ঝুঁকি নিতে ভয় পায়, করদাতা রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না এবং সাধারণ মানুষ মনে করে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা নেই—তখন অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি বাধাগ্রস্ত হয়। আব্দুল হাই সরকারের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি এই সংকটকে কেবল আর্থিক সংকট হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে একটি কাঠামোগত ও মানসিক সংকট হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন।
তার মতে, বর্তমান সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে, যা বহু বছরের ভুল নীতি, দুর্বল তদারকি এবং বাস্তবতা বিবর্জিত সিদ্ধান্তের ফল। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত এখন সবচেয়ে বড় চাপের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নীতিগত অসঙ্গতির কারণে ব্যাংকিং খাতের ভিত দুর্বল হয়ে পড়েছে। একসময় যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা শিল্পায়ন ও বাণিজ্যের চালিকাশক্তি ছিল, সেটিই এখন অনেক ক্ষেত্রে অর্থনীতির ঝুঁকির উৎসে পরিণত হয়েছে।
আব্দুল হাই সরকার মনে করেন, অতীতে নেওয়া অনেক পদক্ষেপ সমস্যার সমাধানের বদলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশেষ করে অর্থনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাবকে তিনি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখেন। তার মতে, অর্থনীতিবিদ হওয়া এবং অর্থনীতি পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। নীতি তৈরি করা সহজ, কিন্তু সেটিকে বাস্তবতায় কার্যকর করা অনেক বেশি কঠিন। কারণ বাস্তব অর্থনীতিতে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত থাকে বাজার, মানুষের আচরণ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির মতো বহু জটিল উপাদান।
তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে আসে যে, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রায়ই বাস্তব অভিজ্ঞতার চেয়ে তাত্ত্বিক ধারণা বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। ব্যাংকিং খাতের ক্ষেত্রেও তিনি একই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তার মতে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তার অনেকগুলো বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি, বরং আস্থার সংকট আরও বেড়েছে।
তবে বর্তমান কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেতৃত্ব সম্পর্কে তিনি তুলনামূলক ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। তার মতে, বর্তমান নেতৃত্বের বড় শক্তি হলো তারা ব্যবসায়িক বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করছেন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে কথা বলছেন। আব্দুল হাই সরকার মনে করেন, নীতিনির্ধারণে ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও শিল্পোদ্যোক্তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ বাস্তব অর্থনীতির অভিজ্ঞতা ছাড়া শুধু দাপ্তরিক চিন্তা দিয়ে টেকসই সমাধান সম্ভব নয়।
তার বিশ্লেষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে করব্যবস্থার প্রশ্ন। বহু বছর ধরে বাংলাদেশে “ট্যাক্স নেট বাড়ানোর” কথা বলা হলেও বাস্তবে নতুন করদাতা তৈরির কার্যকর উদ্যোগ খুব কম দেখা গেছে। একই করদাতাদের উপর বাড়তি চাপ দিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু কর সংস্কৃতির মৌলিক সমস্যাগুলো অমীমাংসিত থেকে গেছে। আব্দুল হাই সরকার মনে করেন, কর আদায়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে আস্থাহীনতা এবং জটিল প্রশাসনিক সংস্কৃতি।
তিনি বলেন, অনেক করদাতার মধ্যেই এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, যারা নিয়মিত কর দেন, তারাই বেশি হয়রানির শিকার হন। এর ফলে নতুন করদাতারা কর কাঠামোর মধ্যে আসতে আগ্রহ হারান। তার মতে, কর প্রশাসনের আচরণ ও মানসিকতায় পরিবর্তন আনা ছাড়া এই সংকট কাটবে না। করদাতাকে সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে দেখার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে তাকে অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। একজন করদাতা যদি বিশ্বাস করেন যে তার দেওয়া তথ্যকে সম্মান করা হবে এবং তাকে অযথা হয়রানি করা হবে না, তাহলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দেওয়ার প্রবণতা বাড়বে।
এই জায়গায় তিনি ক্ষুদ্র ও অনানুষ্ঠানিক খাতকে কর কাঠামোর আওতায় আনার পক্ষে মত দেন। আন্তর্জাতিক উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অনেক দেশে ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সহজ করব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে জটিল হিসাব বা অতিরিক্ত কাগজপত্রের ঝামেলা নেই। বাংলাদেশেও প্রযুক্তিনির্ভর ও সহজ কর কাঠামো তৈরি করা গেলে বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারবেন।
বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে তার উদ্বেগও অত্যন্ত স্পষ্ট। তার মতে, বর্তমানে দেশে অর্থের সংকটের চেয়ে বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা। ব্যাংকগুলোতে তারল্য থাকলেও উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন না। কারণ তারা নিশ্চিত নন যে পর্যাপ্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে কি না, উৎপাদিত পণ্য বাজারে বিক্রি হবে কি না, কিংবা সামগ্রিক ব্যবসা পরিবেশ কতটা স্থিতিশীল থাকবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। কোথাও গ্যাসের সংকট, কোথাও বিদ্যুতের ঘাটতি, কোথাও আবার বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে উৎপাদন কমাতে হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলো এই চাপ আরও বেশি অনুভব করছে।
আব্দুল হাই সরকার মনে করেন, শিল্পখাতের সংকটকে শুধু ব্যাংক ঋণের সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঋণ পেয়েও টিকে থাকতে পারছে না। সমস্যার মূল জায়গা হচ্ছে উৎপাদন ও বাজারের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা। কোনো শিল্প যদি তার উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে না পারে, তাহলে সেখানে কর্মসংস্থানও টিকবে না, ঋণও নিয়মিত থাকবে না এবং শেষ পর্যন্ত পুরো শিল্পই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে।
এই জায়গায় তিনি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও দেন। তার মতে, কেবল বন্ধ কারখানা পুনরায় চালুর ঘোষণা দিলেই হবে না; বরং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অবস্থা মূল্যায়ন করতে হবে। কোন কারখানা কেন বন্ধ হয়েছে, সেখানে বাজার সংকট আছে কি না, ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা রয়েছে কি না, নাকি জ্বালানি ঘাটতির কারণে উৎপাদন বন্ধ হয়েছে—এসব বিশ্লেষণ ছাড়া পুনরুজ্জীবন পরিকল্পনা কার্যকর হবে না।
তার বিশ্লেষণে বারবার উঠে আসে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের শিল্পায়নের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের উপর। বর্তমানে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না শুধুমাত্র জ্বালানির অভাবে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তার মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বড় ধরনের শিল্পায়ন কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টি—কোনোটিই টেকসই হবে না।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য নতুন চাপ তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারেও মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হবে। ফলে অর্থনীতি পরিচালনায় এখন আরও বাস্তবভিত্তিক এবং সতর্ক নীতি প্রয়োজন।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, সরকার বর্তমানে উচ্চ সুদে ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করায় ব্যাংকগুলো ঝুঁকিহীন বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমছে। উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় অর্থায়ন পাচ্ছেন না এবং শিল্পখাতে বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তার মতে, উচ্চ সুদের হার ব্যবসার জন্য বড় বাধা। কারণ ব্যবসায়ীরা তখন নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চান না।
তবে তিনি এটাও বলেন, সুদের হারই একমাত্র সমস্যা নয়; বরং ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, বন্দর, করসংক্রান্ত জটিলতা—সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তার মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ নিয়ে আরও গভীর আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই রাজনৈতিক সংঘাত ও বিতর্কই প্রধান হয়ে ওঠে। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি ইতিবাচক নয় বলে তিনি মনে করেন।
আব্দুল হাই সরকারের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক প্রত্যাশার মধ্যে ব্যবধানের প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে প্রায়ই অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানকে রাজনৈতিক স্লোগানের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু বাস্তবে অর্থনীতি চলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বাজার বাস্তবতার উপর। ফলে রাতারাতি বড় পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি মানুষের কাছে আকর্ষণীয় শোনালেও বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন।
তাঁর বক্তব্য যে জায়গায় এসে দাঁড়ায়, সেটি মূলত রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের প্রশ্ন। তিনি মনে করেন, সরকার যদি ব্যবসায়ীকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে, কর প্রশাসন যদি করদাতাকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং ব্যাংক যদি উদ্যোক্তার উপর আস্থা হারায়, তাহলে অর্থনীতির চাকা কখনোই পূর্ণ গতিতে চলবে না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য তাই শুধু নীতি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন মানসিকতার পরিবর্তনও। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত, অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ এবং সর্বোপরি—রাষ্ট্র, ব্যবসায়ী ও নাগরিকের মধ্যে নতুন করে আস্থা তৈরি করাকেই তিনি বর্তমান সংকট উত্তরণের প্রধান শর্ত হিসেবে দেখছেন।





