মানবসভ্যতার ইতিহাসে কারাগার এক প্রাচীন ব্যবস্থা। ইসলামি শাসনের শুরু থেকে এই ব্যবস্থার বিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ইসলামের প্রথম যুগ থেকে পরবর্তী কয়েক যুগের কারাগার ব্যবস্থাপনা, সংস্কার, নিপীড়ন, মুক্তি ও জ্ঞানচর্চা নিয়ে ৪ পর্বের রচনার আজ তৃতীয় পর্ব।
কারাগার সাধারণত মানুষের সৃষ্টিশীলতাকে রুদ্ধ করে দেয়, কিন্তু ইসলামি সভ্যতার ইতিহাসে আমরা এর উল্টো চিত্র দেখতে পাই। অনেক যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম ও গবেষক তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজগুলো সম্পন্ন করেছেন জেলের নির্জন প্রকোষ্ঠে।
তাঁদের কাছে কারাগার ছিল এক নিরবচ্ছিন্ন গবেষণাগার, যেখানে বাইরের জগতের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে তাঁরা আত্মনিয়োগ করেছিলেন জ্ঞান সাধনায়।
কূপের গভীর থেকে ‘আল-মাবসুত’
ইমাম সারাখসির (মৃ. ৪৮৩ হি.) ঘটনা ছিল কারা–ইতিহাসে বিস্ময়কর। তৎকালীন ফারগানা অঞ্চলের এক বাদশাহর অন্যায্য সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেওয়ায় তাঁকে ওজজন্দের একটি গভীর কূপে বন্দী করা হয়। দীর্ঘ দশ বছরেরও বেশি সময় তিনি সেই অন্ধকার কূপে কাটান। তাঁর কাছে কোনো বই, খাতা বা কলম ছিল না।
সুলতান যখন তাঁর কাছ থেকে সব বই, কাগজ ও কলম কেড়ে নেন, তখন তিনি বিচলিত না হয়ে কয়লা দিয়ে কারাগারের দেয়ালে লেখা শুরু করেন।
কিন্তু তাঁর মেধা ও স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। তাঁর ছাত্ররা প্রতিদিন সেই কূপের ওপর এসে বসত এবং তিনি নিচ থেকে জোর আওয়াজে পাঠদান করতেন। ছাত্ররা ওপর থেকে সেই লেকচারগুলো লিখে নিত। এভাবেই হানাফি ফিকহের কালজয়ী ৩০ খণ্ডের বিশাল বিশ্বকোষ আল-মাবসুত রচিত হয়।
গ্রন্থটির শেষে তিনি আবেগপূর্ণ ভাষায় লিখেছিলেন, “এটি ইবাদত অধ্যায়ের শেষ অংশ, যা অত্যন্ত পরিষ্কার ও সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে; এটি সেই ব্যক্তির পক্ষ থেকে শ্রুতিলিখিত—যিনি জুমার নামাজ ও জামাতে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত ও অবরুদ্ধ।” (মাহমুদ আল-কাফাউয়ি, কাতায়েবু আলামিল আখইয়ার, পৃষ্ঠা ৪২, পাণ্ডুলিপি সংস্করণ)
ইমাম ইবনে তাইমিয়া: কেল্লা যখন গবেষণাগার
ইমাম ইবনে তাইমিয়া (মৃ. ৭২৮ হি.) তাঁর জীবনের বড় একটা অংশ দামেস্ক ও কায়রোর বিভিন্ন কারাগারে কাটিয়েছেন। তাঁর জন্য কারাগার ছিল আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের এক নির্জন স্থান। তিনি বলতেন, “শত্রুরা আমার কী ক্ষতি করবে? আমার জান্নাত ও বাগান তো আমার বুকের ভেতরেই আছে।”
কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি বহু গবেষণাধর্মী রিসালা ও কিতাব রচনা করেন। তাঁর ছাত্র ইবনুল কাইয়িম বর্ণনা করেছেন, একবার সুলতান যখন তাঁর কাছ থেকে সব বই, কাগজ ও কলম কেড়ে নেন, তখন তিনি বিচলিত না হয়ে কয়লা দিয়ে কারাগারের দেয়ালে লেখা শুরু করেন। তাঁর অমর কীর্তি মাজমুউল ফাতাওয়া’র অনেক অংশ এই বন্দী জীবনেরই ফসল। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪/১৩৫, দারুল হিজর, কায়রো, ১৯৯৭)
আন্দালুসের কবি ও রাজপুত্র আবু আব্দুল মালিক আল-তালিককে যখন ১৬ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়, তখন সেই একাকীত্ব তাঁকে করে তুলেছিল সেই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।
ইমাম আহমদের অবিচলতা
আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে যখন ‘কোরআন সৃষ্ট’ কি না সেই বিতর্ক চরমে পৌঁছে, তখন ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে (মৃ. ২৪১ হি.) শিকলবন্দী করে সাধারণ অপরাধীদের জেলে নিক্ষেপ করা হয়। সেখানে তাঁকে প্রচণ্ড চাবুক মারা হতো। কিন্তু জেলের ভেতরেও তিনি তাঁর পাঠদান বন্ধ করেননি।
তাঁর ছাত্র হানবাল ইবনে ইসহাক বলেছেন, “আমরা শিকলবন্দী অবস্থায় ইমামের কাছে আসতাম এবং তিনি আমাদের হাদিস ও ফিকহ পড়াতেন। এমনকি শিকল পরা অবস্থাতেই তিনি বন্দীদের নিয়ে জামাতে নামাজ পড়তেন।” (জাহাবি, সিয়ারু আলামিন নুবালা, ১১/২৫০, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১৯৮৫)
তাঁর এই আপসহীন অবস্থান ইসলামি আকিদাকে এক মহা বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিল।
রাজবন্দীদের রচিত সাহিত্য
শুধু ধর্মতত্ত্ব নয়, ইতিহাস ও সাহিত্যের অমূল্য কিছু কাজও সম্পন্ন হয়েছে কারাগারে। ইব্রাহিম ইবনে হিলাল আল-সাবিকে যখন বাগদাদের সুলতান আদদু দৌলা বুয়াইহি বন্দী করেন, তখন তাঁর মুক্তির শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে বুয়াইহি বংশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস নিয়ে একটি বই লিখতে হবে।
সেই শর্তের অধীনে জেলে বসে তিনি রচনা করেন ঐতিহাসিক গ্রন্থ আল-তাজি। (ইবনে সায়ি, আদ-দুররুল সামিন ফি আসমাইল মুসান্নিফিন, পৃষ্ঠা ৯৪, দারুল কুতুব, বৈরুত, ২০০৯)
একইভাবে আন্দালুসের কবি ও রাজপুত্র আবু আব্দুল মালিক আল-তালিককে যখন ১৬ বছরের দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়, তখন সেই একাকীত্ব তাঁকে করে তুলেছিল সেই যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর কবিতায় ফুটে উঠত কারাগারের কষ্ট আর মুক্তির হাহাকার।
এই সকল মনীষীর কর্মশক্তি থেকে প্রমাণ হয়, শরীরকে বন্দী করা গেলেও মানুষের চিন্তাশক্তি ও বিশ্বাসকে কখনও শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না।
ইয়েমেনি ইমামদের রচনা
ইয়েমেনের ইমাম মাহদি লি-দিনিল্লাহ (মৃ. ৮৪০ হি.) যখন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন, তখন তিনি বসে থাকেননি। জেলের ভেতরেই তিনি জাইদি ফিকহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিতাব আল-আজহার রচনা করেন, যা আজও সেই অঞ্চলের আইনি কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি। (আল-জিরিকলি, আল-আলাম, ১/২১৪, দারুল ইলম লিল-মালাইন, বৈরুত, ২০০২)
এই সকল মনীষীর কর্মশক্তি থেকে প্রমাণ হয়, শরীরকে বন্দী করা গেলেও মানুষের চিন্তাশক্তি ও বিশ্বাসকে কখনও শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। কারাগারের দেয়াল তাঁদের জন্য কোনো বাধা ছিল না, বরং তা ছিল গভীর ধ্যানের এক নিভৃত আলয়।
সমাপনী পর্বে আমরা দেখব সাধারণ বন্দীদের যাপিত জীবন, নারীদের কারাগার এবং মুক্তির সেই সোনালী মুহূর্তগুলোর গল্প।



