সবই দিয়ে দিলাম যা যা আমার, চিঠিতে ছেলেকে রাহুল

সবই দিয়ে দিলাম যা যা আমার, চিঠিতে ছেলেকে রাহুল

শুটিংয়ে গিয়ে সমুদ্রের নীল জলরাশিই যে কাল হয়ে দাঁড়াবে, তা কে জানত! ভারতের ওড়িশার তালসারি সৈকতে ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের শুটিং করতে গিয়ে সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে মারা গেলেন জনপ্রিয় টালিউড অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। ৪২ বছর বয়সী এই অভিনেতার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ গোটা টালিউড। একদিকে যখন সহকর্মীরা প্রিয় বন্ধুর এমন অকাল প্রয়াণ মেনে নিতে পারছেন না, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে ছেলে সহজের উদ্দেশ্যে লেখা রাহুলের একটি আবেগঘন পুরনো চিঠি। যা পড়ে চোখের জল ধরে রাখতে পারছেন না অনুরাগীরা।

সবই দিয়ে দিলাম যা যা আমার, চিঠিতে ছেলেকে রাহুল

ভারতীয় গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, চিঠিতে রাহুল ছেলের কাছে তার পিতৃত্ব, সংগ্রাম, ভালোবাসা এবং জীবনের মূল্যবোধ নিয়ে গভীর কিছু কথা তুলে ধরেছেন।

প্রকাশিত সেই চিঠিতে অভিনেতা লিখেছিলেন, এই চিঠিটা আজকে ‘ফাদারস ডে’ বলে লিখতে বসা। যদিও তোমার বাবা নিজে বেহদ্দ বাংলা মিডিয়াম। জীবনেও ‘ফাদারস ডে’, ‘মাদারস ডে’ এ গুলো আলাদা করে জানত না, কিন্তু কুঁজোর যেমন চিৎ হয়ে শুতে ইচ্ছে করে, আমারও আজকাল এ সব উদযাপন করতে ইচ্ছা করে। আসলে কিছুই না, তোমাকে কাছে পাওয়ার অজুহাত।‘

বাবা মায়ের বন্ধুত্বের কথা শেয়ার করে অভিনেতা আরও লেখেন, ‘জানো সহজ, আমি আর তোমার মা তখন থেকে বন্ধু যখন তোমার মায়ের ১৪ বছর বয়স ছিল, আর আমার ২১। সব ধারাবাহিকে আমরা ভাই-বোন। যেহেতু ছোট, তাই অন্যদের ছেড়ে শেষে আমাদের শট নেওয়া হতো। আর আমরা দু’জন সেটের কোনায় বসে আড্ডা মেরে যেতাম। তোমার মা ছিল বেহালার একজন অ্যাকাউন্টস শিক্ষকের মেয়ে আর আমি খুব সাধারণ এক সরকারি চাকুরের ছেলে। আমরা দু’জন এই ইন্ডাস্ট্রির কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, মন দিয়ে অভিনয়টুকু করতে।

তোমাকে এই গল্প কেন বলছি জানো? যদি কখনও তুমি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তা হলে তুমি জানবে তুমি প্রিভিলেজড, যে প্রিভিলেজ একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে, ঘটনাচক্রে যারা তোমার বাবা মা।‘

তিনি আরও লেখেন, এই ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই যদি কাজ করতে ইচ্ছে হয় তোমার, আমি তোমাকে অনুরোধ করব প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিও। কারণ যে মানুষটি তোমাকে চা দিচ্ছেন, তিনি হয়তো তোমার বাবা-মাকেও ছোট দেখেছেন। উপার্জন আর ক্ষমতার আতসকাঁচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই। এ রকম অশিক্ষায় তুমি বড় হবে না, এটুকু আশা তো করতেই পারি, কী বলো?’

এরপর পরিবার নিয়ে আবেগী হয়ে রাহুল লেখেন, “যে দিন আমরা প্রথম খবর পাই, তুমি আমাদের জীবনে আসছো, আমরা আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম জানো? তোমার মা গুচ্ছের সব অ্যাপ ডাউনলোড করে ফেলল। রোজ আমাকে আপডেট দিত, ‘এখন ওর সাইজ আপেলের মতো’, ‘এখন ওর সাইজ আনারসের মতো’, আরও কত কী! তার পর যখন তুমি হলে, তোমার মায়ের আর একটা রূপ দেখলাম। তুমি জানো না হয়তো, তোমার মা তোমাকে কোনও দিন বাজার চলতি বেবিফুড কিনে খাওয়ায়নি। সব নিজের হাতে বানাত। তাতে যদি সারা দিন লাগে, তো লাগুক। তোমার মায়ের তোমার জন্য অনেক সংগ্রাম, অনেক আত্মত্যাগ। তুমি কতটা মনে রাখবে, তা তোমার সিদ্ধান্ত।

আজ তোমার মা ইনস্টাগ্রামে যথেষ্ট এস্থেটিক ছবি দেওয়ার পরেও উড়ো কমেন্ট ভেসে আসে ‘লজ্জা করে না আপনার? আপনি কিনা মা?’ না, এ নিয়ে কোনও দুঃখবোধ আছে ভেবো না, গন্ডারের চামড়া ধার নিয়ে তবে সেলিব্রিটি হওয়া যায়, এ আমরা শিখে গিয়েছি। শুধু তোমাকে বলছি, তোমার মায়ের লড়াইয়ের একটা আন্দাজ দেওয়ার জন্য।

আমরা, সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে দেখতে পাই না। মায়েরা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন। তোমার মাও রেখেছে। কিন্তু আমি চাইব, তুমি সেই ক্ষতগুলোর শুশ্রূষা করবে। মায়ের পিঠের ছুরিগুলো যদি সরাতে নাও পারো, তোমার একটু আদরই মায়ের জন্য যথেষ্ট হবে।”

চিঠির সবশেষে রাহুল তার ছেলে সহজকে লেখেন, ‘এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কোন হরিদাস পাল যে তোমাকে এত জ্ঞান দিচ্ছে? আমি তোর বাপ (হাঃ হাঃ), দূর সম্পর্কেরই হই, বাপ তো বটে! সেই উপলক্ষে একটু জ্ঞান দেওয়ার অধিকার জন্মে যায়ই। আমি তোমাকে আমার ভাগের সব ক’টা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি।

বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথগুলোকেও পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে পারো এর পর থেকে। আর হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস। আমার ভাষা। বাংলা। হ্যাঁ, বাংলা ভাষা। আর শুধু সেই বাংলা ভাষা নয়, যেটা আমরা দক্ষিণ কলকাতায় বলি। বাংলা তার সমস্ত উপভাষা, ডায়ালেক্ট নিয়ে যে প্রবল ঐশ্বর্যের অধিকারী, সেই সব ঐশ্বর্য তোমাকে দিয়ে দিলাম। সবই দিয়ে দিলাম, যা যা আমার।‘

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে ময়নাতদন্তের পর কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়েছে রাহুলের শববাহী গাড়ি। তমলুক থেকে সরাসরি রাহুলের বিজয়গড়ের বাড়িতেই তার মৃতদেহ নিয়ে আসা হবে এবং এরপর কেওড়াতলা শ্মশানে এই অভিনেতার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে জানা যায়।

Scroll to Top