ব্যস্ত জনজীবন। চারপাশ শুধু মানুষ। বাসে বসে আছি। শেষ গন্তব্য ঢাকা। কিশোরগঞ্জ টু ঢাকা। কটিয়াদী বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা। জানালার পাশে আছি। হকারদের শব্দে কানের বারোটা বাজছে। যদিও ঘড়িতে বাজে আটটা পেরিয়ে। ধুলাবালুর কারণে দৃষ্টিতে ঝাপসা দেখছি। হঠাৎ কানে শব্দ এল, ‘আমার টাকা নিয়ে গেল, আমার টাকা নিয়ে গেল।’
উচ্চ সরে এক ভদ্রলোক লোক বলছে। এরই মধ্যে টাকা নিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে ধরে ফেলে পাবলিক। মানে ভদ্রলোক ছেলেটির কাছ থেকে বাদাম কেনে। বাসের জানালা দিয়ে টাকা দিলে ছেলেটি ৫০ টাকার নোট নিয়ে দৌড় দেয়। আসলে বাদামের দাম ছিল মাত্র ১০ টাকা। ছেলেটি ৪০ টাকা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পাবলিক ছেলেটিকে ধরে দুই গালে দুটি কষে দুটি থাপ্পড় দেয়। ছেলেটির হাত থেকে বাদামগুলো মাটিতে পড়ে যায়।
ছেলেটি কান্না শুরু করে। ভদ্রলোক গাড়ি থেকে নেমে ছেলেটিকে বলে, ‘দে আমার ৪০ টাকা ফেরত দে?’
ছেলেটি কান্না করে বলে, ‘আমি টাকা খুচরো করে আনতে যাচ্ছিলাম। কারণ, আমার কাছে ৫০ টাকার খুচরো নেই।’
ছেলেটির কথা শুনে পাবলিক উল্টে যায়। ভদ্রলোকের ওপরে খেপে যায়। ভদ্রলোক কথা বলতে গেলে, থাকে পাবলিক আটকে দেয়। ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘তোর কত টাকার বাদাম নষ্ট হয়েছে?’
‘হাজার টাকা তো হবেই।’
সবাই ভদ্রলোককে চাপ দেয়। এবং শেষ পর্যন্ত ১ হাজার টাকা উদ্ধার করে ভদ্রলোককে ছেড়ে দেয়। বাস ছেড়ে দিয়েছে। আমি মনে মনে হাসছি। কী থেকে কী হয়ে গেল।
এটা নিয়ে অত ভাবার কিছু নেই। এমনটা হয়ে থাকে প্রায়ই। আমি দেখেছি এমন ঘটনা। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ছেলেটিকে যারা ধরে ছিল, যে ব্যক্তি থাপ্পড় মেরেছিল, সে ও ছেলে একই দলের লোক। মাঝখানে ভদ্রলোকের ১ হাজার টাকা গচ্চা গেল।
আবারও বাস দাঁড়াল। বিরক্তিকর অবস্থা। কিন্তু কিছু করার নেই। বাইরে দৃষ্টি যেতে চোখে পড়ে, একদল ছাত্রী। তারা সবাই এই বাসে উঠছে। দেখতে বেশ ভালো লাগছে। দুটি মেয়ে বাদে সবাই মাস্ক পরা। সবাই বাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও আমার পাশে সিট খালি আছে। কিন্তু কেউ বসছে না। বাস চলছে। আমি একটি মেয়েকে বলি, ‘আপনি চাইলে এখানে বসতে পারেন?’
মেয়েটি হেসে দিল। এবং তার সামনে থাকা মেয়েটিকে টান দিয়ে আমার পাশে বসিয়ে দিল। আমি ভেতরে-ভেতরে হাসছি। কিছু বলছি না। কিছু বলার ইচ্ছে হলেও বলছি না। কারণ, মেয়েটি দেখতে যতটা সুন্দরী তার চেয়ে বেশি লাজুক লাগছে।
দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো আস্তে করে কথা বলছে আর হাসছে। আমি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। এর মধ্যে একটি মেয়ে ‘এশা’ বলে ডাক দিল। আমার পাশে থাকা মেয়েটি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। আর অমনি দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো আবার হেসে উঠল। এমন অবস্থায় পাশে বসে থাকা মেয়েটি কী করবে বুঝতে পারছে। মেয়েদের বয়স কম। সবে কলেজে পা রেখেছে, সেটা বুঝতে পারছি। হাইস্কুল থেকে কলেজে গেলে প্রতিটি ছেলেমেয়ের মনে আলাদা একটা আনন্দ কাজ করে।
আমি পাশের সিটে বসা মেয়েটিকে বললাম, ‘আপনারা কি কলেজে পড়ছেন?’
মেয়েটি আমার দিকে তাকাল। বাহ কী সুন্দর চোখ। সত্যি অসাধারণ সুন্দর। কিন্তু মুখটা তো মাস্ক দিয়ে ঢাকা। আমি আবার বললাম আপনার নাম কি ‘এশা’?
‘জি।’
‘এশা নামের অর্থ জানেন তো?’
‘জি না?’
‘এশা নামের অর্থ হলো, টার্গেট, মানে লক্ষ্য।’
‘তাই নাকি, আমি তো ওইভাবে ভাবিনি।’
‘যদি আরও স্পষ্ট করে বলি, তাহলে বলতে হয়, ইচ্ছা কিংবা অভিলাষ। দোয়া করি আপনার লক্ষ্য পূরণ হোক।’
এর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মেয়ে বলল, ‘আচ্ছা ভাইয়া আমার নামের অর্থ কি একটু বলবেন?’
‘হ্যাঁ শিউর, হোয়াই নট, টেল মি ইউর নেইম?’
মেয়েটি হাসি মুখে বলল, ‘আমার নাম প্রেমা।’

প্রেমা নামটা শুনে হাসি মুখে বলি, ‘প্রেমার শব্দের অর্থ হলো মমতা, স্নেহ কিংবা ভালোবাসা।’
আমার কথা শুনে মেয়েরা হেসে উঠল। আমি আবারও বলি, ‘প্রেমা হলো গভীর অনুরাগ।’
ইতিমধ্যে মেয়েগুলো আমাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। বাসের মধ্যে অনেকে আমার দিকে তাকাচ্ছে। বাট কেউ বিরক্ত হচ্ছে না। কিন্তু সবকিছুর আড়ালে আমি আমার পাশের সিটে বসে থাকা মেয়েটিকে দেখছি। কেন জানি আলাদা একটা ফিল কাজ করছে মনে এশাকে ঘিরে। এশা কোনো কথা বলছে না। এই মেয়েটি বোধ হয় কথা বলতে অতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না। যদি মেয়েটির মুখটা দেখা যেত, তাহলে আরও ভালো লাগত।
শীতের সকাল। জানালা দিয়ে সূর্যে তাতানো রোদ বাসের ভেতর আসছে। একটা খয়েরি রঙের চাদর দিয়ে নিজেকে মুড়িয়ে রেখেছি। বাসের কনট্রাক্টর ভাড়া তুলছে। মেয়েগুলো ভাড়া দিচ্ছে। এশা পাশে আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা কোন কলেজের স্টুডেন্টস?’
এশা চুপ। কিন্তু প্রেমা নামের মেয়েটি বলল, ‘ভৈরব রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজে পড়ছি। আমরা সবাই নতুন ভর্তি হয়েছি ইন্টারে।’
‘ও আচ্ছা, ভেরি গুড। তোমাদের জন্য দোয়া রইল।’
প্রেমা বলল, ‘আচ্ছা ভাইয়া আপনার নামটা কি জানতে পারি?’
‘আমার নাম হলো অভি। আমি যাচ্ছি ঢাকা।’
‘ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আপনি কত সুন্দর করে কথা বলেন।’
‘আমার কাছ থেকে নয়, এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের কাছ থেকে শেখার আছে। এটার জন্য ভালো মন ও মানসিকতার প্রয়োজন। কেননা এই পৃথিবীতে অনেক ধরনের মানুষ আছে। সুতরাং একেকজনের চিন্তাধারা, জ্ঞান একেক রকম।’
বাস চলছে। মেয়েগুলো চুপ হয়ে গেছে। হঠাৎ এশা বলল, ‘আপনার নামের অর্থটা বলবেন?’
আমি রীতিমতো শক খেলাম। যে মেয়েটা কোনো কথা বলতে চাচ্ছে না। চুপচাপ বসে আছে। সে কিনা আমার নামের অর্থ জানতে চায়? কিন্তু সেই অর্থ তো এশা নামের সঙ্গে মিলে যায়, এখন তাহলে…!
এশা আবারও বলল, ‘কী? অভি নামের অর্থ বলেন?’
‘আমার নামের অর্থ বলতে কিছুটা অপ্রস্তুত আমি?’
এশা আর কিছু বলছে না। সে চুপ। প্রেমা বলল, ‘অভি ভাইয়া এটা কিন্তু ঠিক না। নিজের নামের অর্থ নিশ্চয় আপনি জানেন, তাহলে বলছেন না কেন?’
বাস ভৈরবের কাছাকাছি চলে এসেছে। ছাত্রীগুলো একটু পড়ে নেমে যাবে। তাদের ভেতরে কিউরিওসিটি কাজ করছে। বিশেষ করে এশার মধ্যেও। তাহলে বোধ হয় এখন এশার মুখটা দেখতে পারব। আমি আস্তে করে এশাকে বললাম, ‘আপনি সারাক্ষণ মাস্ক পরা অবস্থায় কীভাবে থাকেন?’
এশা আমার দিকে তাকাল। কিন্তু কিছু বলল না। আমি বললাম, ‘আমার নামের অর্থটা বলতে পারি, যদি আপনি মাস্কটা একবার খোলেন?’
এশা বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। কিছুটা অপ্রস্তুত ছিলাম এই দৃশ্যের জন্য। বাট এশা চুপ ছিল। বাস দাঁড়াল। এখন মেয়েগুলো নেমে যাবে। আমি এশাকে বললাম, ‘আমার নামের অর্থ হলো, তোমার নামের অর্থ যা আমারও তা।’
এশা বাস থেকে নেমে গেছে। আমি জানালা দিয়ে এশার দিকে তাকিয়ে আছি। একটু দূরে গিয়ে এশা মাস্ক ওপেন করে আমার দিকে তাকায়। ঠিক তখন বাসও ছেড়ে দেয়। এশার মুখটা চোখে ভেসে আছে। কী দেখলাম। এ তো সাক্ষাৎ পরি। মেয়ে মানুষ এত সুন্দর হয়! আর যেভাবে মাস্ক খুলে তাকিয়েছে, আমি অবাক!
বাস চলছে। চলন্ত বাসে নতুন প্রেমের আবির্ভাব। আচ্ছা এটা তো প্রেমই, নাকি ক্ষণিকের ভালো লাগা! আমি কি সত্যি এশাকে ভুলতে পারব। কী থেকে কী হয়ে গেল। চাদরটা আবারও ভালোভাবে গায়ে দিয়ে সিটে হেলান দিলাম। চোখটা বন্ধ করি। একি এশাকে দেখতে পাচ্ছি। (চলবে)
* লেখক: মোবারক হোসেন হৃদয়, সিঙ্গাপুর।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: dp@prothomalo.com



