১৯৭১ সালের হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ স্বীকৃতি দিতে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন – DesheBideshe

১৯৭১ সালের হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ স্বীকৃতি দিতে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন – DesheBideshe

১৯৭১ সালের হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ স্বীকৃতি দিতে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব উত্থাপন – DesheBideshe

ওয়াশিংটন, ২২ মার্চ – ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত অমানবিক ঘটনাবলিকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। গত ২০ মার্চ কংগ্রেস সদস্য গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন।

বর্তমানে এটি প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির কাছে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের দোসররা পরিকল্পিতভাবে ভয়াবহ নিপীড়ন চালিয়েছিল।

এই দমন অভিযানের ফলে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে, লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয় এবং অসংখ্য নারী ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হন। বিশেষ করে বাঙালি জনগোষ্ঠী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে চালানো এই সামরিক অভিযানকে মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রস্তাবটিতে ২৫ মার্চ রাতের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে।

সেখানে উল্লেখ করা হয়, ওই রাত থেকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানটি ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালিদের দমন ও নিশ্চিহ্ন করা। এই অভিযানের মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল। ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের কথাও প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর মধ্যে তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের পাঠানো বিখ্যাত ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ অন্যতম। ওই টেলিগ্রামে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর কর্মকাণ্ডকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং মার্কিন সরকারের নীরব ভূমিকার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

এছাড়া ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘দ্য সানডে টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিশ্ববাসীর সামনে প্রথম তুলে ধরা হয় কীভাবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল।

পাশাপাশি, মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির একটি প্রতিবেদনও প্রস্তাবে স্থান পেয়েছে। ১৯৭১ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দমন অভিযান, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছিল।

এতে বলা হয়, সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে তাদের সম্পদ ধ্বংস, নির্যাতন এবং হত্যার ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। নারী নির্যাতনের বিষয়টিও প্রস্তাবে বিশেষভাবে স্থান পেয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, যুদ্ধকালীন সময়ে দুই লাখেরও বেশি নারী পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে চরম নির্যাতনের শিকার হন, যা এই সংঘাতের ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়কে আরও প্রকট করে তোলে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। উত্থাপিত ওই প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা ১৯৭১ সালের এই মর্মান্তিক ঘটনাগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’, ‘যুদ্ধাপরাধ’ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

একই সঙ্গে এই অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবটি শেষ পর্যন্ত গৃহীত হলে তা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে গণহত্যা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্বীকৃতির দাবি আরও জোরালো হবে এবং বিশ্বমঞ্চে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এ এম/ ২২ মার্চ ২০২৬



Scroll to Top