ইসলামে ঈদের ইতিহাস, গুরুত্ব ও করণীয় আমল

ইসলামে ঈদের ইতিহাস, গুরুত্ব ও করণীয় আমল

ঈদ শব্দটি আরবি। যার অর্থ খুশি, আনন্দ, অনুষ্ঠান, উৎসব, পর্ব ইত্যাদি। মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের এই দুটি উৎসব উপহার হিসেবে দিয়েছেন। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে—আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন মদিনাবাসীরা নির্দিষ্ট দুটি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে।

ইসলামে ঈদের ইতিহাস, গুরুত্ব ও করণীয় আমল

রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, এ দুটি দিন কিসের? সবাই বলল, জাহেলি যুগে আমরা এ দুই দিন খেলাধুলা করতাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দুই দিনের পরিবর্তে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। তা হলো ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিন। (আবু দাউদ, হাদিস : ১১৩৪)

এই প্রতিস্থাপনের (অর্থাৎ পূর্বের উৎসবের পরিবর্তে ঈদ নির্ধারণের) কারণ হলো, প্রতিটি উৎসবই সাধারণত কোনো ধর্মীয় নিদর্শন প্রতিষ্ঠা, অথবা দ্বিনের কোনো মহান ব্যক্তিত্বকে সম্মান করা, কিংবা এ ধরনের কোনো বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকে।

সুতরাং এ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ওই দুই দিনের জাহেলি যুগের খেলাধুলা ও উৎসবের যে ভিত্তি ছিল, তা মুছে ফেলা হয়েছে এবং এর পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মহান আল্লাহকে স্মরণ করার মাধ্যমে মুসলমানদের আনন্দ-উৎসবের দিন। এই দিনগুলোতে ইসলাম কিছু ইবাদতও নির্ধারণ করেছে, যাতে পুরো সময় শুধু খেলাধুলা ও বিনোদনে না কাটে এবং আল্লাহর বাণীকে উচ্চে তুলে ধরার বিষয়টি উপেক্ষিত না হয়। নিম্নে ঈদ উদযাপনে সাহাবায়ে কেরামের কৃত আমলগুলো তুলে ধরা হলো—
তাকবির ও আল্লাহর স্মরণ : ঈদের দিন সাহাবায়ে কেরাম তাকবির ধ্বনিতে তাদের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ করতেন। পবিত্র কোরআনেও ঈদের দিন তাকবির দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূরণ করো এবং তিনি তোমাদের যে হেদায়েত দিয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করো এবং যাতে তোমরা শোকর করো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৫)
হাদিস শরিফে আছে, ঈদের দিন সাহাবায়ে কেরাম তাকবির দিতেন। (বুখারি, হাদিস : ৯৭১)

ঈদের নামাজে অংশগ্রহণ : সবাই মিলে ঈদের নামাজ আদায় করতেন, এটাই ছিল দিনের প্রধান আমল।

(ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩০৮)

শুভেচ্ছা বিনিময় : সাহাবায়ে কেরাম একে অপরকে দোয়া দিতেন—‘তাকব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’; অর্থ : মহান আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের নেক আমলগুলো কবুল করুন। (ফাতহুল বারি : ২/৪৪৬)

ঈদের দিন মিষ্টিজাতীয় খাবার : আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। (বুখারি, হাদিস : ৯৫৩)

বৈধ বিনোদন ও খেলাধুলা : ঈদের দিন সাহাবায়ে কেরাম বৈধ খেলাধুলা করতেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, আর ঈদের দিন সুদানিরা বর্শা ও ঢালের খেলা করত। আমি নিজে আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম অথবা তিনি নিজেই বলেছিলেন, তুমি কি তাদের খেলা দেখতে চাও? আমি বললাম, হ্যাঁ, অতঃপর তিনি আমাকে তাঁর পেছনে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে দিলেন যে আমার গাল ছিল তাঁর গালের সঙ্গে লাগান। তিনি তাদের বললেন, তোমরা যা করছিলে তা করতে থাকো, হে বনু আরফিদা। পরিশেষে আমি যখন ক্লান্ত হয়ে পড়লাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, তোমার দেখা কি যথেষ্ট হয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ, তিনি বললেন, তা হলে চলে যাও। (বুখারি, হাদিস : ৯৫০)

কোনো কোনো বর্ণনায় ঈদের দিন সাহাবায়ে কেরাম পরস্পর তরমুজ নিক্ষেপ করে আনন্দ করার কথাও পাওয়া যায়।

দরিদ্রদের সঙ্গে ঈদের খুশি ভাগাভাগি : ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সদকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন—অশ্লীল কথা ও বেহুদা কাজ থেকে (রমজানের) সাওমকে পবিত্র করতে এবং মিসকিনদের খাদ্যের ব্যবস্থার জন্য। যে ব্যক্তি (ঈদের) সালাতের আগে তা আদায় করে সেটা কবুল সদকা হিসেবে গণ্য হবে। আর যে ব্যক্তি সালাতের পরে আদায় করে, তা সাধারণ দান হিসেবে গৃহীত হবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ১৬০৯)

পরিবার ও প্রিয়জনদের খোঁজ রাখা : আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় যে তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বর্ধিত হোক, যে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখে। (বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইসলামের নির্দেশিত বৈধ পদ্ধতিতে ঈদ উদযাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Scroll to Top