পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকা মহানগর থেকে মহাসড়ক, নৌপথ থেকে সীমান্ত—সবখানেই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ও বহুমাত্রিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
রাজধানীর নিরাপত্তায় যৌথভাবে কাজ করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঈদ ঘিরে দেশব্যাপী বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যা ঈদের আগের সময় থেকে পরবর্তী দিনগুলোতেও বহাল থাকবে।
তিন স্তরের নিরাপত্তা, মাঠে র্যাবের ৩২ টিম
র্যাব জানিয়েছে, ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা—সদরঘাট, সায়েদাবাদ, শ্যামপুর, সূত্রাপুর ও কামরাঙ্গীরচরে ৩২টি টিম মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহ ও গোয়েন্দা নজরদারির জন্য থাকবে সিভিল টিম।
যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে স্থাপন করা হয়েছে ২৪ ঘণ্টা সচল কন্ট্রোল রুম। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, টিকিট কালোবাজারি বা যাত্রী হয়রানির অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে র্যাব।
র্যাবের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক কর্নেল ইফতেখার আহমেদ বলেন, সারাদেশে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কন্ট্রোল রুম, স্ট্রাইকিং রিজার্ভ, মোবাইল ও ফুট পেট্রোল, ভেহিক্যাল স্ক্যানার এবং সিসিটিভি মনিটরিংয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা হচ্ছে।
জাতীয় ঈদগাহে ৪ স্তরের নিরাপত্তা
রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে প্রধান জামাতকে কেন্দ্র করে চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা নিয়েছে ডিএমপি। ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও মোতায়েন থাকবে সদস্যরা। পুরো এলাকা থাকবে সিসিটিভির আওতায়।
নিরাপত্তার স্বার্থে মুসল্লিদের শুধুমাত্র জায়নামাজ নিয়ে আসার অনুরোধ জানানো হয়েছে। আর্চওয়ে গেটের মাধ্যমে তল্লাশি শেষে ঈদগাহে প্রবেশ করতে হবে।
হেলিকপ্টার ও ড্রোনে নজরদারি
এবারের ঈদ নিরাপত্তায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা—হেলিকপ্টার ও ড্রোন প্রযুক্তি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মহাসড়ক বা রেলপথে বড় দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতার জন্য হেলিকপ্টার ইউনিট প্রস্তুত থাকবে।
মহাসড়কের ১৫৫টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে। প্রয়োজনে ড্রোনের মাধ্যমে যান চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হবে। পদ্মা ও যমুনা সেতুর টোল প্লাজায় দ্রুত টোল আদায় ও বিকল যানবাহন সরাতে অতিরিক্ত রেকার রাখা হয়েছে।
ফাঁকা ঢাকায় বাড়তি টহল
পুলিশের হিসাবে, ঈদে প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়তে পারে। ফলে ফাঁকা বাসাবাড়িতে চুরি-ডাকাতির ঝুঁকি বাড়ে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় টহল জোরদার করা হয়েছে এবং গলিপথেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
ডিএমপি নাগরিকদের পরামর্শ দিয়েছে—সন্দেহজনক চলাফেরা বা অস্বাভাবিক কিছু দেখলে দ্রুত জাতীয় জরুরী সেবা সার্ভিস ৯৯৯ নম্বরে ফোন করতে বা নিকটস্থ থানায় জানাতে।
টিকিট কালোবাজারি ও ভাড়া নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি
ঈদযাত্রার অন্যতম সমস্যা টিকিট কালোবাজারি ঠেকাতে এবার জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে। টার্মিনালগুলোতে বিশেষ নজরদারি টিম ও গোয়েন্দা সদস্যরা সক্রিয় থাকবে। নির্ধারিত ভাড়ার বেশি আদায় করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সীমান্ত ও নৌপথে সতর্কতা
সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক প্রবাহ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও কোস্টগার্ডকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, নৌপথে দুর্ঘটনা মোকাবেলায় ডুবুরি দল, রেসকিউ বোট ও আধুনিক সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হাইওয়ে সংলগ্ন ট্রমা সেন্টার ও হাসপাতালগুলোকে জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
সার্বিক প্রস্তুতিতে আশ্বাস
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সমন্বিত বাহিনী মোতায়েন এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার মাধ্যমে এবারের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন রাখতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতাই এই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





