স্তব্ধ ইথার, অনন্ত শূন্যতা: বিদায় সুমন ভাই | চ্যানেল আই অনলাইন

স্তব্ধ ইথার, অনন্ত শূন্যতা: বিদায় সুমন ভাই | চ্যানেল আই অনলাইন

আজ একরাশ অনন্ত শূন্যতা বুকের ওপর যেন বিশাল এক হিমশীতল পাথরের মতো চেপে বসেছে। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, বিশিষ্ট অভিনেতা এবং রেডিও ভূমির স্টেশন চিফ শামস সুমন আজ আর আমাদের মাঝে নেই। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন আমাদের শামস সুমন ভাই। আমি এবং আমরা সবাই আজ তাকে ছাড়া এক অজানা, গন্তব্যহীন এবং অনন্ত শূন্যতার দিকে যেন হেঁটে চলছি। এ যেন এক বিয়োগান্তক উপন্যাসের বিষাদময় বাস্তবতা, যেখানে প্রিয় চরিত্রটি হঠাৎ করেই হারিয়ে হয়ে যায়, আর চারপাশের পৃথিবী ঢেকে যায় গাঢ় শোকের চাদরে।

‘রেডিও ভূমি ৯২.৮ এফএম’—আমার কণ্ঠের ঠিক এই কথাটি দিয়েই ইথারে প্রথম ধ্বনিত হয়েছিল রেডিও ভূমির সম্প্রচারের প্রথম আহ্বান। সেই শুরুর মাহেন্দ্রক্ষণে সুমন ভাই আমাকে আবেগে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, “তৌফিক ভাই, আপনি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন।” আমার প্রতি তার এই অগাধ আর নিঃশর্ত বিশ্বাস আমাকে সবসময় অবাক করত। রেডিও ভূমির শুরুর দিককার যতগুলো পে-অফ ছিল, তার সবগুলোই তিনি আমাকে দিয়ে, অর্থাৎ আমার কণ্ঠেই ধারণ করিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, বীরশ্রেষ্ঠদের ওপর বিশেষ অডিও সিরিজ এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদ ভাষা সংগ্রামীদের ওপর নির্মিত অডিও সিরিজেও তিনি আমাকে দারুণভাবে উৎসাহ জুগিয়ে ভয়েসওভার নিয়েছিলেন।স্তব্ধ ইথার, অনন্ত শূন্যতা: বিদায় সুমন ভাই | চ্যানেল আই অনলাইন

উনার সঙ্গে কত শত স্মৃতি, কত আড্ডা, কত সৃজনশীল আলোচনা যে হয়েছিল, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তার সংস্পর্শে এসেই রেডিও মাধ্যমটিকে আমি সম্পূর্ণ অন্য এক দৃষ্টিকোণ থেকে ভালোবাসতে শুরু করি। এফএম রেডিওর জগতে যখন তথাকথিত ‘বাংলিশ’ উপস্থাপনার আধিপত্য, তখন রেডিও ভূমিকে তিনি প্রমিত বাংলা এবং দেশজ সংস্কৃতির মূল ধারায় সযত্নে নোঙর করিয়েছিলেন। একঝাঁক তরুণ কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে গুটি গুটি পায়ে রেডিও ভূমিকে এগিয়ে নেওয়ার নেপথ্যের প্রধান কারিগর ছিলেন তিনি।

সুমন ভাই ছিলেন বাংলাদেশের অভিনয়জগতের একজন অসাধারণ এবং শক্তিমান অভিনেতা। পর্দায় কিংবা মঞ্চে তার সাবলীল ও দাপুটে অভিনয় যেমন দর্শককে মুগ্ধ করত, তেমনি ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন স্নিগ্ধতার মূর্ত প্রতীক। মানুষ হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক, যার মুখে সবসময় লেগেই থাকত মায়াবী এক হাসি। নিজের ভেতরের না-বলা কথাগুলো, অব্যক্ত বেদনাগুলো তিনি নিজের ভেতরেই সযত্নে লুকিয়ে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। সব কঠিন কাজ তিনি করতেন একেবারে নীরবে, নিভৃতে।

মৃত্যুর মাত্র চার-পাঁচদিন আগেও আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের কক্ষে সুমন ভাইয়ের সঙ্গে একটি ছোট মিটিং হয়। সেদিনও তার মুখে সেই চেনা হাসিটি অম্লান ছিল। ডয়চে ভেলের সঙ্গে চ্যানেল আইয়ের ডিজিটাল সম্পর্ক স্থাপনে তার যে অনবদ্য ভূমিকা ছিল, তা-ও এক কথায় অতুলনীয়।

আজ এটি বিশ্বাস করতেও ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, সুমন ভাইয়ের সঙ্গে আর কোনোদিন কথা হবে না, তার কক্ষে, আমার কক্ষে কিংবা অফিসের নিচে—আর কখনোই তার সঙ্গে দেখা হবে না। হবে না, ফোনে কোনো কথা। চিরচেনা সেই মহূর্তগুলো যেন বড্ড অচেনা, বড্ড নীরব। চ্যানেল আই এবং রেডিও ভূমি আজীবন তাকে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণে রাখবে। সুমন ভাইয়ের আত্মা চিরশান্তিতে থাকুক।

Scroll to Top