মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আজ বিশ্ব অর্থনীতিকে এমন এক খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে, যা হয়তো গত কয়েক দশকেও দেখা যায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরানের ওপর হামলার জেরে তেহরান যখন প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে, তখন বিশ্ববাজার এক নজিরবিহীন ও চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই উদ্ভূত ও ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি বা আইইএ তাদের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ জরুরি তেল মজুত ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ধনী দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই সংস্থাটির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এমন সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে একটি প্রশ্নই বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে: এই বিপুল পরিমাণ তেল কি চলমান এই মহাসংকট মোকাবিলার জন্য আদৌ যথেষ্ট, নাকি এটি কেবলই একটি সাময়িক পদক্ষেপ?
চলমান এই জ্বালানি সংকটের সূত্রপাত ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি তেহরানে হামলা চালায় এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে। এই ঘটনার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ রাতারাতি বদলে যায়। এর জবাবে ইরান অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ইসরায়েল, মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন জ্বালানি অবকাঠামোতে ভয়াবহ পাল্টা হামলা চালায়। তবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে তখন, যখন তেহরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে দেয়। এই প্রণালিটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহ শৃঙ্খলের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধমনী, যেখান দিয়ে প্রতিদিন গড়ে দুই কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, যা পুরো বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এই সংকটের ঠিক আগে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৫ ডলার, যা প্রণালি বন্ধ হওয়ার খবরের সঙ্গে সঙ্গেই ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ইরানের নেতারা ইতোমধ্যে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, তাদের ওপর হামলা অব্যাহত থাকলে তারা এক লিটার তেলও এই প্রণালি দিয়ে যেতে দেবে না। পরিস্থিতি এতটাই আশঙ্কাজনক যে, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইএমএফের সাবেক অর্থনীতিবিদ অলিভিয়ের ব্ল্যানচার্ড সতর্ক করে বলেছেন, তেল বহনকারী ট্যাংকারগুলোকে যদি ইরানের হামলা থেকে রক্ষা করা না যায়, তবে তেলের দাম দীর্ঘ সময়ের জন্য এই অস্বাভাবিক উচ্চ পর্যায়েই অবস্থান করবে। আইইএ এই পুরো পরিস্থিতিকে বিশ্ব তেল বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা বলে স্পষ্টভাবে আখ্যায়িত করেছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্ভাব্য বিপর্যয় অনুধাবন করে আইইএ-এর ৩২টি সদস্য রাষ্ট্র তাদের কৌশলগত মজুত ব্যবহারে প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করলেও, শেষ পর্যন্ত এক ঐতিহাসিক চুক্তিতে পৌঁছায়। তারা তাদের মোট ১২০ কোটি ব্যারেল সরকারি মজুতের এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল জরুরি অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইইএ-এর ইতিহাসে এটি একটি বিরল ঘটনা। এর আগে মাত্র পাঁচবার সংস্থাটি তাদের জরুরি মজুত থেকে তেল ছেড়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ, ২০০৫ সালের প্রলয়ঙ্করী হারিকেন ক্যাটরিনা, ২০১১ সালের লিবিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আগ্রাসনের সময়কার দুটি ঘটনা। তবে এবারের ছাড়ের পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর আইইএ সদস্যরা যে ১৮ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছেড়েছিল, এবারের ৪০ কোটি ব্যারেলের ঘোষণা তার দ্বিগুণেরও বেশি।
এই বিশাল উদ্যোগে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দেশটির কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যা এই সমন্বিত প্রচেষ্টার একটি বিশাল অংশ। ১৯৭৫ সালে আরব তেল অবরোধের পর যুক্তরাষ্ট্র তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের বৃহত্তম কৌশলগত তেলের মজুত গড়ে তোলে, যার সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা প্রায় ৭২ কোটি ব্যারেল। বর্তমানে ওয়াশিংটনের কাছে প্রায় ৪১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে, যা টেক্সাস ও লুইসিয়ানার ভূগর্ভস্থ লবণের গুহায় অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় সংরক্ষিত আছে। মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহ থেকেই এই তেল সরবরাহ শুরু হবে এবং এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় ১২০ দিন সময় লাগবে।
আপাতদৃষ্টিতে আইইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বিশাল মনে হলেও, বাস্তব চিত্র বেশ জটিল ও উদ্বেগজনক। লন্ডনের চ্যাথাম হাউসের মিডল ইস্ট অ্যান্ড নর্থ আফ্রিকা প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ফেলো নিল কুইলিয়াম এই পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি এটিকে একটি “ওয়ান-শট সলিউশন” বা এককালীন সমাধান এবং অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার মতে, এই মজুত একবার শেষ হয়ে গেলে বাজারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখার জন্য বিকল্প কোনো বাস্তব পথ আর খোলা থাকবে না। প্রতিদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে দুই কোটি ব্যারেল তেলের যে বিপুল ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা বিবেচনায় নিলে এই ৪০ কোটি ব্যারেলের মজুত বড়জোর তিন সপ্তাহের মধ্যেই পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে।
নিহত আয়াতুল্লাহর ছেলে ও ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি তার প্রথম ভাষণে আরও বেশি আক্রমণাত্মক সুর তোলার পর তেলের দাম যেভাবে আবারও লাফিয়ে বেড়েছে, তা এই আশঙ্কার সত্যতাই প্রমাণ করে। প্যারিস-ভিত্তিক আইইএ-এর প্রধান ফাতিহ বিরলও এই রূঢ় বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় তেল ও গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন শুরু হওয়া। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ফুয়েলস অব দ্য ফিউচার-এর জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মাকসিম সোনিন আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন যে, ভূ-রাজনৈতিক মূল সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শুধু মজুত ছেড়ে এই বিশাল ও জটিল বাজার ঠিক করা কখনোই সম্ভব নয়।
সরবরাহের গতি এবং সময়সীমা নিয়েও বাজারে গভীর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। কাগজে-কলমে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন ৪৪ লাখ ব্যারেল তেল ছাড়ার সক্ষমতা দাবি করলেও প্রকৃত সরবরাহের হার এর চেয়ে অনেক কম। মার্কিন জ্বালানি দপ্তর জানিয়েছে যে, তেল বিক্রি ও ছাড়ার পর সেটি বাজারে পৌঁছাতে অন্তত ১৩ দিন সময় লাগতে পারে। আর এশিয়ার দেশগুলোতে, যেখানে এই যুদ্ধের কারণে তেলের ঘাটতি সবচেয়ে বেশি প্রকট রূপ নিয়েছে, সেখানে জাহাজে করে এই তেল পৌঁছাতে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের গ্লোবাল কমোডিটি স্ট্র্যাটেজি প্রধান হেলিমা ক্রফট জানিয়েছেন যে, রিজার্ভ থেকে কত দ্রুত তেল উত্তোলন করা যায় তার ওপরই মূলত সরবরাহ নির্ভর করবে এবং এই ধীরগতি বাজারের সংকট সমাধানে খুব একটা কাজে আসবে না। এত বিপুল পরিমাণ তেল রাতারাতি শোধনাগারগুলোতে পৌঁছানো সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন তা জাহাজে করে সাগর পাড়ি দিয়ে আনতে হয়।
এর পাশাপাশি, তেলের ধরন নিয়েও একটি বড় প্রযুক্তিগত সংকট তৈরি হয়েছে যা এই পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলছে। বাজারে ছাড়তে যাওয়া ৪০ কোটি ব্যারেল তেলের পুরো ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের মজুতে থাকা তেলের একটি বড় অংশ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মজুতে ১৫ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল ‘সুইট ক্রুড’ (যাতে সালফারের পরিমাণ কম) এবং ২৬ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল ‘সাওর ক্রুড’ (যাতে সালফারের পরিমাণ বেশি) রয়েছে। সুইট ক্রুড পরিশোধন করা সহজ ও সাশ্রয়ী হলেও সাওর ক্রুড বা ভারী তেল পরিশোধনের জন্য অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তি ও বিশাল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোর সাওর ক্রুড পরিশোধনের সেই সক্ষমতা থাকলেও, ভারতসহ এশিয়ার অন্যান্য অনেক আমদানিকারক দেশের সেই আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা নেই। ফলে মজুত থেকে তেল ছাড়লেও তা পরিশোধন করে ব্যবহার উপযোগী করা অনেক দেশের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে, যা জ্বালানি সংকটকে আরও ঘনীভূত করতে পারে।
এই বহুমুখী সংকট সামাল দিতে ট্রাম্প প্রশাসন কিছু বিকল্প ও জরুরি পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে। বৈশ্বিক বাজারে দ্রুত সরবরাহ বাড়ানোর লক্ষ্যে সাগরে ভাসমান প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল রাশিয়ান তেল কেনার ওপর থেকে ৩০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে মার্কিন অর্থ দপ্তর। এছাড়াও, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ করতে ও খরচ কমাতে মার্কিন মেরিটাইম আইন ‘জোনস অ্যাক্ট’ সাময়িকভাবে স্থগিত করার বিষয়টিও গভীরভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যদিও হোয়াইট হাউস জানিয়েছে যে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বিশ্লেষকরা এই সমস্ত পদক্ষেপকে একটি সাময়িক ‘ব্যান্ড-এইড’ বা জোড়াতালি দেওয়া সমাধান হিসেবেই দেখছেন। নিয়ম অনুযায়ী আইইএ সদস্য দেশগুলোর অন্তত ৯০ দিনের আমদানির সমপরিমাণ জরুরি তেলের মজুত রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ডেটা ফার্মগুলোর অনুমান অনুযায়ী, আইইএ সদস্য দেশগুলো তাদের বর্তমান উৎপাদন দিনে সর্বোচ্চ ১২ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত বাড়াতে পারবে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন যে দুই কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়, তার তুলনায় এই অতিরিক্ত উৎপাদন নিতান্তই সামান্য একটি ভগ্নাংশ মাত্র।
বর্তমান এই উত্তাল প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এটা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আইইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের এই ঐতিহাসিক ও বিশাল তেল ছাড়ের ঘোষণা বাজারকে হয়তো একটি সাময়িক মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মূল কারণগুলো নিরসন করে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত না করা পর্যন্ত, বিশ্ব অর্থনীতিকে এই তীব্র জ্বালানি সংকটের অন্ধকার ও অনিশ্চিত পথেই হাঁটতে হবে।





