
তেহরান, ৮ মার্চ – মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এখন আর কেবল আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বহু বছর ধরে এই দুই দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই সংঘাতের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ইরান ও ইসরায়েল সংকটকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ কমে আসছে।
গত কয়েক বছরে বেইজিং ও তেহরানের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে ঘনিষ্ঠ হয়েছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ইরানের তেল রপ্তানির একটি বিশাল অংশ এখন চীনে যাচ্ছে যা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানকে টিকে থাকতে সহায়তা করছে। এর বিনিময়ে চীন কম দামে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে। পাশাপাশি সামরিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও দুই দেশের যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। পারস্য উপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় চীন রাশিয়া এবং ইরানের যৌথ নৌ মহড়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য বজায় থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি সেই সমীকরণে পরিবর্তন আনছে।
অনেকে মনে করেন ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর চাপ বা হামলাকে কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখা ভুল হবে। বরং এটি পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের একটি কৌশলগত লড়াই যেখানে তারা সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদিও পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত এখনো ঘটেনি তবে ইউক্রেন যুদ্ধ বা তাইওয়ান ইস্যুর মতো ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে একটি নতুন ধরনের প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এখন সরাসরি যুদ্ধের বদলে প্রক্সি সংঘাত ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের কৌশল মুখ্য হয়ে উঠছে।
জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়লে বা তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের ফলে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। বিশ্লেষকদের মতে ঢাকার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখা। কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে যুক্তরাষ্ট্র চীন ইউরোপসহ সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই হবে বিচক্ষণতা।
একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎসের সন্ধান এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তি ও সংলাপের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়াই হবে বাংলাদেশের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যতের পথ।
এস এম/ ৮ মার্চ ২০২৬





