মানুষের ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ১১ বছরের তাইয়েবা কাঁদতে কাঁদতেই বলছিল—“আমার মায়ের হত্যার বিচার চাই। আমরা তো এতিম হয়ে গেলাম।”
আজ শনিবার কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরির সামনে আয়োজিত এক মানববন্ধনে মায়ের জন্য বিচার চেয়ে এমন হৃদয়বিদারক কথা বলে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকাণ্ডের শিকার সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনার বড় মেয়ে তাইয়েবা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে বলেন, “আমার মাকে খুব কষ্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যারা আমার মাকে মেরেছে তাদেরও তেমন শাস্তি দেওয়া হোক। আমার মায়ের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি হল করা হোক। মা আমাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম ছিলেন। এখন মা নেই—বাবাকে আর আমাকে কাজ করতে হবে।”
তাইয়েবার কণ্ঠে তখন শুধু বিচার চাওয়ার আহাজারি নয়, ছিল ভেঙে পড়া একটি পরিবারের অসহায়তার গল্পও।
সে জানায়, মাকে হারানোর পর থেকে ঘুম হারাম হয়ে গেছে ছোট ভাই-বোনদের। “আমার ছোট ভাই-বোনরা রাতে ঘুমাতে পারে না। সারাক্ষণ মাকে খোঁজে,” বলে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন তাইয়েবা।
মানববন্ধনে উপস্থিত ছিল তাইয়েবার পুরো পরিবার। নিহত শিক্ষিকার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান, বড় মেয়ে তাইয়েবা, মেজ মেয়ে তাবাসসুম (৯), তিন বছরের ছেলে সাজিদ আবরার এবং মাত্র ছয় মাস বয়সী ছোট্ট আমেনা—সবাই যেন দাঁড়িয়ে ছিল একটি অমোচনীয় শূন্যতার সাক্ষী হয়ে।
মায়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেনি তাবাসসুমও। নয় বছরের এই শিশুটি কাঁদতে কাঁদতেই বলে, “আমার ছোট ভাইটা সারাক্ষণ কাঁদে, মা মা বলে ডাকে। আমার মাকে ফিরিয়ে দিন। যারা আমার মাকে মেরেছে তাদের সবার ফাঁসি চাই।”
এসময় বক্তারা বলেন, কর্মস্থলে একজন শিক্ষককে নৃশংসভাবে হত্যা করা পুরো শিক্ষক সমাজের জন্য চরম উদ্বেগজনক। তারা এ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন, ঘাতক ফজলুসহ মামলার সব আসামিকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। তা না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন তারা। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা বিভিন্ন প্রতিবাদী প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়ান। সেখানে লেখা ছিল—
“খুনি ফজলুর ফাঁসি চাই”, “রক্তখেকো শ্যামসুন্দরের ফাঁসি চাই”, “রক্তখেকো বিশ্বজিতের ফাঁসি চাই”,
“রুনা ম্যামের খুনিদের ফাঁসি চাই”, “কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করো”, “আমাদের মাকে ফিরিয়ে দাও।”
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, একজন শিক্ষককে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবারকেই নয়, পুরো শিক্ষাঙ্গনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। দ্রুত খুনিদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
বৃহস্পতিবার নিহতের স্বামীর এজাহার দায়েরের পর শুক্রবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মূল অভিযুক্ত ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর শনিবার অভিযুক্ত দুই শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে সাময়িক বহিষ্কার করে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত পৃথক তিন অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়।

ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক বলেন, ‘হত্যা মামলায় তাদের নাম থাকায় তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া এ ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি করা হয়েছে।’
এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচারসহ পাঁচ দাবিতে উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন বিভাগটির শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি একদিনের শোক পালন ও কালোব্যাজ ধারণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জানা যায়, ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৫৪ অনুসারে থানায় প্রাপ্ত আমলযোগ্য অপরাধের প্রাথমিক তথ্যে নাম থাকায় বিভাগটির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার ও উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা হলের বর্তমান সহকারী রেজিস্ট্রার এবং মামলার ২ নম্বর আসামি বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও মামলার ৩ নম্বর আসামি শ্যাম সুন্দর সরকার এবং সহকারী অধ্যাপক ও মামলার ৪ নম্বর আসামি হাবিবুর রহমানকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
গত বুধবার দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারী ফজলুর রহমানের ছুরিকাঘাতে নিহত হন সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক অধ্যাপক ড. আসমা সাদিয়া রুনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের ২২৬ নম্বর কক্ষে তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ওই কক্ষেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের কর্মচারী ফজলুর রহমানকে আত্মহত্যার চেষ্টায় দেখেছেন বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী। খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়ের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করেন। পরে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে নিলে শিক্ষিকাকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।




