আবারও পাকিস্তান-আফগান সংঘাত, বহু হতাহতের দাবি | চ্যানেল আই অনলাইন

আবারও পাকিস্তান-আফগান সংঘাত, বহু হতাহতের দাবি | চ্যানেল আই অনলাইন

আবারও উত্তেজনা বেড়েছে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে। সীমান্তে রাতভর দু’দেশের তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে পাকিস্তানকে লক্ষ্য করে আফগানিস্তান হামলা চালানোর পর ইসলামাবাদ পাল্টা হামলা চালায়। এতে উভয় পক্ষের একাধিক সদস্য নিহতের খবর পাওয়া গেছে

বিবিসি জানিয়েছে, উভয় পক্ষই একে অপরকে প্রথমে হামলা করার অভিযোগ করেছে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তারা আফগান হামলার জবাবে কাবুল ও কান্দাহারসহ শহরগুলোতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।

তালেবানের সামরিক মুখপাত্র মাওলাভি ওয়াহিদুল্লাহ মোহাম্মদী বলেছেন,  তাদের প্রতিশোধমূলক অভিযান বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে শুরু করা হয়েছে। গোষ্ঠীর প্রধান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, আক্রমণে অসংখ্য পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছে এবং অন্যদের আটক করা হয়েছে – তবে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ এই দাবি অস্বীকার করেছে।

পাকিস্তানের একজন সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন,পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে প্রতিশোধমূলক অভিযানে আফগান তালেবান সরকারের ১৩৩ জন সদস্য নিহত হয়েছেন এবং আরও ২০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন।

নিরাপত্তা সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সীমান্তে তালেবান সরকারের হামলা চালানোর পর পাক নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান গাজাব-লিল-হক্ক শুরু করে। অভিযানে ২৭টি তালেবান পোস্ট ধ্বংস এবং নয়টি দখল করা হয়েছে।

Recent Posts

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতিদৃষ্টে মনে হচ্ছে গণতন্ত্র কাজ করতে শুরু করেছে। মুক্তি লাভ করেছে দেশের অবরুদ্ধ শাসনতন্ত্র। নৈতিক শক্তি ফিরে পেয়েছে প্রশাসন। পুলিশ ফিরে পেয়েছে হারানো আত্মবিশ্বাস। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের আলামত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষ করে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। নির্বাচনের পর বিজয়ী দলের একশ্রেণির নেতা-কর্মীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের পরিচয় অতীতে আমরা পেয়েছি বহুবার। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সেই জনগণের ওপরই যখন বিজয়ী দলের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের একটি শ্রেণি জুলুম করতে শুরু করে, তখন গণতন্ত্র প্রহসনে পরিণত হয়। প্রশাসনও কাত হয়ে পড়ে। জনগণের সেবক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি দলের সেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। অবরুদ্ধ হয় সুশাসনের পথ। এবার তেমনটি দেখা যায়নি। সত্য তো সত্যের মতোই সুন্দর। এখন পর্যন্ত সরকার এবং সরকারি দল যে পথে অগ্রসর হচ্ছে, তার প্রশংসা করতে না পারাটা হবে সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক। যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা-এই দৃষ্টিভঙ্গি গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না। ভালোর প্রশংসা করতে কৃপণতা যেমন বাঞ্ছনীয় নয়, মন্দ কাজের সমালোচনায়ও দ্বিধা করা উচিত নয়। সমালোচনা সহ্য করার শক্তি ও সাহস ক্ষমতাসীনদের থাকতে হবে। সমালোচনা বা কোনো কাজের নিন্দা করলে চক্ষুশূল বানিয়ে শায়েস্তা করবেন আর প্রশংসা করলে পিঠ চাপড়ে পুরস্কৃত করবেন-গণতন্ত্র এমনটা সমর্থন করে না। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের ছোট-বড় রাজনৈতিক দল ও দলের নেতাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে সাড়ে পাঁচ দশক কালের মধ্যেও গণতন্ত্র শক্ত পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমান দলমতনির্বিশেষে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সবার হয়ে উঠতে তিনি নিজে বোধ হয় প্রস্তুত ছিলেন না। কিংবা তাঁর পরামর্শকরা হয়তো তাঁকে সবার নেতা হয়ে উঠতে দেননি। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় সারা দেশ ভেঙে পড়েছিল। এমন নয় যে ওই জনসভায় কেবল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ বা শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীরা যোগ দিয়েছিলেন। জনসভায় অনুপস্থিতদের মধ্যে যাঁরা রেডিও খুলে কান পেতে অপেক্ষা করছিলেন শেখ সাহেবের ভাষণ ও নির্দেশনা শোনার জন্য, তাঁরাও সবাই আওয়ামী লীগের ছিলেন না। কিন্তু অবিসংবাদিত নেতা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র সংগ্রাম কমিটি গঠনের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে হয়তো নিজের অজান্তেই গণতন্ত্রের ওপর দলতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তিনি যখন বললেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সারা দেশে সংগ্রাম কমিটি করার, তখন এটা ম্যান্ডেটরি হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পক্ষে জনজোয়ার তৈরি হয়েছিল। ফলে এই বিচ্যুতি তেমনভাবে কানে লাগেনি। সেটা ছিল সুচের মতো কিন্তু পরে ফাল (লাঙলের চওড়া ধারালো ধাতব অংশ, যা মাটি কর্ষণ করে) হয়ে বেরিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়েই তার কিছুটা প্রকাশ ঘটেছিল। চরমপন্থি কমিউনিস্টরা আলাদাভাবে যুদ্ধ করেছে। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নও আলাদাভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। সেই পরিস্থিতিতে মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। মুজিব বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর শীতল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থে সেসবের প্রামাণ্য বিবরণ পাওয়া যায়। শাসনতন্ত্রস্বাধীনতা-উত্তর জাতীয় সরকার গঠনের দাবি উঠলেও তা উপেক্ষিত হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ইলেকশনে আবারও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে অচিরেই তা নির্দয় মেজরিটির রূপ পরিগ্রহ করেছিল। মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল চরমপন্থার রাজনীতি। এমনকি ছাত্রলীগকে পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ রাখা যায়নি। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও শ্রেণি-সংগ্রামের স্লোগান দিয়ে জাসদ শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছিল। পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগের নির্দয় মেজরিটি অচিরে রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়েছিল। শেখ মুজিব একাত্তরের পাকবাহিনীর দালালদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে রিকনসিলিয়েশনের পথে পা বাড়ালেও দলীয়করণের নীতি পরিহার করেননি। ফলে রিকনসিলিয়েশনের চেষ্টা আখেরে কোনো সুফল দেয়নি। ক্ষমা পাওয়া স্বাধীনতাবিরোধীরা সেটাকে বরং সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের পর যারা ৫৪ বছরের প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বলতে শুরু করেছিল, যারা সংবিধানকে টিস্যু পেপারের মতো ছুড়ে ফেলার আয়োজন করেছিল তারা যে সেই স্বাধীনতাবিরোধীদেরই উত্তরাধিকার বহন করেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ছাত্রলীগের ভিতরে গুপ্তপন্থায় ঢুকে তারা সেই উত্তরাধিকারের দাবি পূরণ করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থান বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়ক ও ছাত্রলীগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছদ্মবেশীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনের ফল নয়। এটি আসলে ২০১৩ সালে শুরু হওয়া গণতন্ত্রের জন্য ধারাবাহিক সংগ্রামের উপসংহার, যে সংগ্রামের নেতা বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান। সময়ের ব্যবধানে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, গণঅধিকার পরিষদ, জোনায়েদ সাকির গণসংহতি এবং গণতন্ত্রকামী আরও কয়েকটি দল সক্রিয়ভাবে এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে। সিপিবি আলাদাভাবে হলেও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ছিল। গণতন্ত্রের এই সংগ্রামে স্বাধীনতাবিরোধী কোনো দল বা গোষ্ঠীর দৃশ্যমান কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের কোটা আন্দোলন কোনো গণ আন্দোলন ছিল না। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শাহাদতবরণ করার পর যখন লাশের পর লাশ পড়তে থাকল তখন দলমতনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ; নারী ও পুরুষ রাজপথে নেমে আসেন। যুগব্যাপী গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিগ্রহ করে চরম রূপ। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর শতসহস্র কর্মী-সমর্থক মাঠে ছিলেন। তাঁরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন। হতাহতদের মধ্যে বিএনপির কর্মী-সমর্থকের সংখ্যাই বেশি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আলাদা কোনো গণসংগঠনও ছিল না। জনগণের কত শতাংশ কোটা আন্দোলনকারীদের নীতি-আদর্শ ধারণ করে তা ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ছাত্রদের দল এনসিপি জামায়াত জোটে যোগ না দিলে সংসদে একটি আসনও পেত কি না, সন্দেহ। সশস্ত্র বাহিনী এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পালন করে কাক্সিক্ষত ঐতিহাসিক ভূমিকা। কিন্তু ড. ইউনূস ও তাঁর অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রদের আন্দোলনকে এমনভাবে মহিমান্বিত করে যাতে মনে হয় সমন্বয়করাই গণ অভ্যুত্থানের একমাত্র কৃতিত্বের দাবিদার। তিনি এই সমন্বয়কদের উপদেষ্টা পরিষদেও যুক্ত করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে যার আর একটি দৃষ্টান্তও নেই। সমন্বয়ক ছাত্রদের আবদার তিনি রক্ষা করেন হৃষ্টচিত্তে। অথচ এই সমন্বয়করা জনগণের তো নয়-ই বৃহত্তর ছাত্রসমাজেরও প্রতিনিধিত্ব করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও তা প্রমাণিত হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী উচ্চ আদালতের রেফারেন্স নিয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। তা সত্ত্বেও নোবেল লরিয়েট উপর্যুপরি প্রকাশ্যে বলতে থাকেন যে ছাত্ররাই তাঁর নিয়োগকর্তা। তিনি নিশ্চয়ই জানতেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের প্রস্তাব করার অধিকার থাকলেও তাঁরা দেশের নির্বাহী প্রধানকে নিয়োগ দিতে পারেন না। সে অধিকার সংবিধান ছাত্রদের দেয়নি। অথচ এসব বলে ড. ইউনূস চোখ বন্ধ করে সমন্বয়কদের দুর্নীতি, অনাচার, মবাচারের সুযোগ করে দেন। আমেরিকায় গিয়ে তিনি একজন সমন্বয়কারীকে আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বলে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রকৃতপক্ষে ড. ইউনূস ছাত্রদের ব্যবহার করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি গ্রামীণ ব্র্যান্ডের এনজিও সরকার কায়েম করার ব্যর্থ প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ও তাঁর সরকার একের পর এক সংবিধান লঙ্ঘন করে সংস্কারের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন। তিনি জাতিকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি কেবল একজন ব্যক্তি নন বরং একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেখানেও মবাচার হয়েছে। জাতীয় ঐক্যের নাম করে তিনি জাতিকে বিভক্ত করেন। ভূলুণ্ঠিত করেন রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদা। প্রথা, রীতিনীতি কোনো কিছুর পরোয়া করেননি। বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো এবং দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী পূর্বাপর সংবিধান ও সাংবিধানিক রীতিনীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ না করলে ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনও হয়তো অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। ইন্টেরিমের প্রশ্রয়ে ক্যাম্পাসে, শাহবাগ মোড়ে এবং রাজপথে খিস্তিখেউড়কে রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত করা হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার ইতিহাস তিনি রিসেট করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানকে তিনি ব্রাত্য করে দিতে চেয়েছিলেন। তদুপরি নিজের পাতে ঝুল টানার নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সতেরো মাসে। আল্লাহর অশেষ রহমত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন জাতিকে সেই দম বন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গণতন্ত্রের পথ সুগম করে চলেছে। গণতন্ত্রের এই অভিযাত্রাকে বিঘ্নিত করার জন্য গোপনে ও প্রকাশ্যে পানি ঘোলা করার চেষ্টাও যে চলছে না, তা বলা যায় না। কাজেই সরকারকে তার গণমুখী নীতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির তৎপরতা সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এখনই যারা সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, তাদের ব্যাপারে ‘কান্ডারি হুঁশিয়ার।’ স্বাধীনতার পক্ষশক্তিগুলোর মধ্যে যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম শত্রুতার রূপ পরিগ্রহ না করে, সে ব্যাপারে কৌঁসুলি হতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় স্বাধীনতাবিরোধী চক্র নিজেদের স্বার্থে যে কারও সঙ্গে মিত্রতার ভান করে গণতন্ত্রের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পরস্পর সম্পূরক। স্বাধীনতা বাঁচলে গণতন্ত্র বাঁচবে, গণতন্ত্র বাঁচলে স্বাধীনতা বাঁচবে – DesheBideshe

নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরিস্থিতিদৃষ্টে মনে হচ্ছে গণতন্ত্র কাজ করতে শুরু করেছে। মুক্তি লাভ করেছে দেশের অবরুদ্ধ শাসনতন্ত্র। নৈতিক শক্তি ফিরে পেয়েছে প্রশাসন। পুলিশ ফিরে পেয়েছে হারানো আত্মবিশ্বাস। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের আলামত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, বিশেষ করে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। নির্বাচনের পর বিজয়ী দলের একশ্রেণির নেতা-কর্মীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের পরিচয় অতীতে আমরা পেয়েছি বহুবার। জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সেই জনগণের ওপরই যখন বিজয়ী দলের মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের একটি শ্রেণি জুলুম করতে শুরু করে, তখন গণতন্ত্র প্রহসনে পরিণত হয়। প্রশাসনও কাত হয়ে পড়ে। জনগণের সেবক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সরকারি দলের সেবকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। অবরুদ্ধ হয় সুশাসনের পথ। এবার তেমনটি দেখা যায়নি। সত্য তো সত্যের মতোই সুন্দর। এখন পর্যন্ত সরকার এবং সরকারি দল যে পথে অগ্রসর হচ্ছে, তার প্রশংসা করতে না পারাটা হবে সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক। যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা-এই দৃষ্টিভঙ্গি গণতন্ত্রের সঙ্গে যায় না। ভালোর প্রশংসা করতে কৃপণতা যেমন বাঞ্ছনীয় নয়, মন্দ কাজের সমালোচনায়ও দ্বিধা করা উচিত নয়। সমালোচনা সহ্য করার শক্তি ও সাহস ক্ষমতাসীনদের থাকতে হবে। সমালোচনা বা কোনো কাজের নিন্দা করলে চক্ষুশূল বানিয়ে শায়েস্তা করবেন আর প্রশংসা করলে পিঠ চাপড়ে পুরস্কৃত করবেন-গণতন্ত্র এমনটা সমর্থন করে না। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের ছোট-বড় রাজনৈতিক দল ও দলের নেতাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গিগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখানে সাড়ে পাঁচ দশক কালের মধ্যেও গণতন্ত্র শক্ত পায়ের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমান দলমতনির্বিশেষে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু সবার হয়ে উঠতে তিনি নিজে বোধ হয় প্রস্তুত ছিলেন না। কিংবা তাঁর পরামর্শকরা হয়তো তাঁকে সবার নেতা হয়ে উঠতে দেননি। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় সারা দেশ ভেঙে পড়েছিল। এমন নয় যে ওই জনসভায় কেবল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ বা শ্রমিক লীগের নেতা-কর্মীরা যোগ দিয়েছিলেন। জনসভায় অনুপস্থিতদের মধ্যে যাঁরা রেডিও খুলে কান পেতে অপেক্ষা করছিলেন শেখ সাহেবের ভাষণ ও নির্দেশনা শোনার জন্য, তাঁরাও সবাই আওয়ামী লীগের ছিলেন না। কিন্তু অবিসংবাদিত নেতা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র সংগ্রাম কমিটি গঠনের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে হয়তো নিজের অজান্তেই গণতন্ত্রের ওপর দলতন্ত্রকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। তিনি যখন বললেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সারা দেশে সংগ্রাম কমিটি করার, তখন এটা ম্যান্ডেটরি হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পক্ষে জনজোয়ার তৈরি হয়েছিল। ফলে এই বিচ্যুতি তেমনভাবে কানে লাগেনি। সেটা ছিল সুচের মতো কিন্তু পরে ফাল (লাঙলের চওড়া ধারালো ধাতব অংশ, যা মাটি কর্ষণ করে) হয়ে বেরিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময়েই তার কিছুটা প্রকাশ ঘটেছিল। চরমপন্থি কমিউনিস্টরা আলাদাভাবে যুদ্ধ করেছে। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নও আলাদাভাবে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। সেই পরিস্থিতিতে মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। মুজিব বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর শীতল দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থে সেসবের প্রামাণ্য বিবরণ পাওয়া যায়। শাসনতন্ত্রস্বাধীনতা-উত্তর জাতীয় সরকার গঠনের দাবি উঠলেও তা উপেক্ষিত হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ইলেকশনে আবারও আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে অচিরেই তা নির্দয় মেজরিটির রূপ পরিগ্রহ করেছিল। মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল চরমপন্থার রাজনীতি। এমনকি ছাত্রলীগকে পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ রাখা যায়নি। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও শ্রেণি-সংগ্রামের স্লোগান দিয়ে জাসদ শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছিল। পার্লামেন্টে আওয়ামী লীগের নির্দয় মেজরিটি অচিরে রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হয়েছিল। শেখ মুজিব একাত্তরের পাকবাহিনীর দালালদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে রিকনসিলিয়েশনের পথে পা বাড়ালেও দলীয়করণের নীতি পরিহার করেননি। ফলে রিকনসিলিয়েশনের চেষ্টা আখেরে কোনো সুফল দেয়নি। ক্ষমা পাওয়া স্বাধীনতাবিরোধীরা সেটাকে বরং সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিল। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের পর যারা ৫৪ বছরের প্রতিশোধ গ্রহণের কথা বলতে শুরু করেছিল, যারা সংবিধানকে টিস্যু পেপারের মতো ছুড়ে ফেলার আয়োজন করেছিল তারা যে সেই স্বাধীনতাবিরোধীদেরই উত্তরাধিকার বহন করেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ছাত্রলীগের ভিতরে গুপ্তপন্থায় ঢুকে তারা সেই উত্তরাধিকারের দাবি পূরণ করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থান বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়ক ও ছাত্রলীগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছদ্মবেশীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনের ফল নয়। এটি আসলে ২০১৩ সালে শুরু হওয়া গণতন্ত্রের জন্য ধারাবাহিক সংগ্রামের উপসংহার, যে সংগ্রামের নেতা বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান। সময়ের ব্যবধানে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, আ স ম আবদুর রবের জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য, গণঅধিকার পরিষদ, জোনায়েদ সাকির গণসংহতি এবং গণতন্ত্রকামী আরও কয়েকটি দল সক্রিয়ভাবে এই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে। সিপিবি আলাদাভাবে হলেও গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ছিল। গণতন্ত্রের এই সংগ্রামে স্বাধীনতাবিরোধী কোনো দল বা গোষ্ঠীর দৃশ্যমান কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের কোটা আন্দোলন কোনো গণ আন্দোলন ছিল না। রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শাহাদতবরণ করার পর যখন লাশের পর লাশ পড়তে থাকল তখন দলমতনির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ; নারী ও পুরুষ রাজপথে নেমে আসেন। যুগব্যাপী গণতান্ত্রিক আন্দোলন পরিগ্রহ করে চরম রূপ। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর শতসহস্র কর্মী-সমর্থক মাঠে ছিলেন। তাঁরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন। হতাহতদের মধ্যে বিএনপির কর্মী-সমর্থকের সংখ্যাই বেশি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আলাদা কোনো গণসংগঠনও ছিল না। জনগণের কত শতাংশ কোটা আন্দোলনকারীদের নীতি-আদর্শ ধারণ করে তা ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটে পরিষ্কার হয়ে গেছে। ছাত্রদের দল এনসিপি জামায়াত জোটে যোগ না দিলে সংসদে একটি আসনও পেত কি না, সন্দেহ। সশস্ত্র বাহিনী এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে পালন করে কাক্সিক্ষত ঐতিহাসিক ভূমিকা। কিন্তু ড. ইউনূস ও তাঁর অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রদের আন্দোলনকে এমনভাবে মহিমান্বিত করে যাতে মনে হয় সমন্বয়করাই গণ অভ্যুত্থানের একমাত্র কৃতিত্বের দাবিদার। তিনি এই সমন্বয়কদের উপদেষ্টা পরিষদেও যুক্ত করেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে যার আর একটি দৃষ্টান্তও নেই। সমন্বয়ক ছাত্রদের আবদার তিনি রক্ষা করেন হৃষ্টচিত্তে। অথচ এই সমন্বয়করা জনগণের তো নয়-ই বৃহত্তর ছাত্রসমাজেরও প্রতিনিধিত্ব করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও তা প্রমাণিত হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী উচ্চ আদালতের রেফারেন্স নিয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। তা সত্ত্বেও নোবেল লরিয়েট উপর্যুপরি প্রকাশ্যে বলতে থাকেন যে ছাত্ররাই তাঁর নিয়োগকর্তা। তিনি নিশ্চয়ই জানতেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের প্রস্তাব করার অধিকার থাকলেও তাঁরা দেশের নির্বাহী প্রধানকে নিয়োগ দিতে পারেন না। সে অধিকার সংবিধান ছাত্রদের দেয়নি। অথচ এসব বলে ড. ইউনূস চোখ বন্ধ করে সমন্বয়কদের দুর্নীতি, অনাচার, মবাচারের সুযোগ করে দেন। আমেরিকায় গিয়ে তিনি একজন সমন্বয়কারীকে আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড বলে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রকৃতপক্ষে ড. ইউনূস ছাত্রদের ব্যবহার করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতো একটি দীর্ঘমেয়াদি গ্রামীণ ব্র্যান্ডের এনজিও সরকার কায়েম করার ব্যর্থ প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। তিনি ও তাঁর সরকার একের পর এক সংবিধান লঙ্ঘন করে সংস্কারের নামে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেন। তিনি জাতিকে ভুলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, রাষ্ট্রপতি কেবল একজন ব্যক্তি নন বরং একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেখানেও মবাচার হয়েছে। জাতীয় ঐক্যের নাম করে তিনি জাতিকে বিভক্ত করেন। ভূলুণ্ঠিত করেন রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক মর্যাদা। প্রথা, রীতিনীতি কোনো কিছুর পরোয়া করেননি। বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো এবং দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী পূর্বাপর সংবিধান ও সাংবিধানিক রীতিনীতির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ না করলে ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনও হয়তো অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। ইন্টেরিমের প্রশ্রয়ে ক্যাম্পাসে, শাহবাগ মোড়ে এবং রাজপথে খিস্তিখেউড়কে রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত করা হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতার ইতিহাস তিনি রিসেট করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানকে তিনি ব্রাত্য করে দিতে চেয়েছিলেন। তদুপরি নিজের পাতে ঝুল টানার নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সতেরো মাসে। আল্লাহর অশেষ রহমত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন জাতিকে সেই দম বন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গণতন্ত্রের পথ সুগম করে চলেছে। গণতন্ত্রের এই অভিযাত্রাকে বিঘ্নিত করার জন্য গোপনে ও প্রকাশ্যে পানি ঘোলা করার চেষ্টাও যে চলছে না, তা বলা যায় না। কাজেই সরকারকে তার গণমুখী নীতি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রবিরোধী শক্তির তৎপরতা সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এখনই যারা সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, তাদের ব্যাপারে ‘কান্ডারি হুঁশিয়ার।’ স্বাধীনতার পক্ষশক্তিগুলোর মধ্যে যাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চরম শত্রুতার রূপ পরিগ্রহ না করে, সে ব্যাপারে কৌঁসুলি হতে হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় স্বাধীনতাবিরোধী চক্র নিজেদের স্বার্থে যে কারও সঙ্গে মিত্রতার ভান করে গণতন্ত্রের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পরস্পর সম্পূরক। স্বাধীনতা বাঁচলে গণতন্ত্র বাঁচবে, গণতন্ত্র বাঁচলে স্বাধীনতা বাঁচবে – DesheBideshe

Scroll to Top