
ঢাকা, ২০ জানুয়ারি – জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার বা জেআইসিতে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হুম্মাম কাদের চৌধুরী জবানবন্দি দিয়েছেন। সাক্ষ্যে তিনি নিজে গুম হওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।
মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে প্রথম দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ছিল। প্রথম সাক্ষী হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে হুম্মামের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
হুম্মাম জানান, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট তাকে গুম করা হয়। শুধুমাত্র বিএনপি করার কারণে তাকে বারবার নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের ফলে সারা শরীরে ঘা ও পায়ে বড় ফোঁড়া তৈরি হয়েছিল। আয়নাঘরে রাখা টেবিলের নিচে লাল কালি দিয়ে সিটিআইবি দেখেছেন তিনি। দিনের হিসাব রাখতে প্রথম দুই মাস একটি পেরেকে দেয়ালে দাগ দিয়েছেন। খাবারের সময় রুটি আসার মাধ্যমে তিনি দিন গণনা করতেন।
তিনি বলেন, ফোঁড়া হওয়ার পর ভেবেছিলেন হাসপাতালে নিলে কেউ চিনতে পারবে, কিন্তু নেওয়া হয়নি। পরে হাঁটতে অসুবিধা হলে ডাক্তার ডাকতে চিৎকার করেন। এক ডাক্তার এসে পরীক্ষা করেন। হাসপাতাল নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে বলা হয় ‘একজন বড় ডাক্তার এসে চিকিৎসা করবেন’। পরদিন তার সেলে কয়েকজন এসে তাকে চৌকির সঙ্গে বেঁধে অপারেশন করেন। এতে তিনি বেঁহুশ হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর মেঝেতে রক্ত, ভেজা গজ ও টিস্যু পড়ে থাকতে দেখেন। এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয় এবং ওষুধের মোড়ক হাতে তুলে আনা হতো। একবার ভুল করে ‘ভিআইপি-১’ লেখা ওষুধের মোড়কও এসেছে, যা দেখে তিনি বুঝেছেন এটি তার কোডনেম।
জবানবন্দিতে হুম্মাম বলেন, মাঝে মাঝে তাকে নির্যাতন করা হতো। হাতে ইনজেকশন দেওয়ায় পুরো শরীরে আগুন ধরে যাওয়ার মতো অনুভূতি হতো। জিজ্ঞাসাবাদের সময় বাবার রাজনীতির বিষয়ে, আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেন কি না এবং বিদেশি কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ আছে কি না জানতে চাইতো। তিনি পাশের সেলের কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ ও খাবারের শব্দ শুনতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জানতে পারেন ওই তেলাওয়াতকারী ব্রিগেডিয়ার আমান আযমী। এতে বুঝতে পারেন তিনি একা নন, আরও বন্দি রয়েছেন। সেলের দুটি দরজা ছিল, লোহার বার ও স্টিলের। একবার ফাঁকা অংশে একজনকে টেনে নিয়ে যেতে দেখেন, জমটুপির নিচে তার দাঁড়ি দেখা যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল বয়স্ক।
সেলের মধ্যে টিউবলাইট ও সিলিং ফ্যান সবসময় জ্বলতো। একবার মারধরের সময় চোখের বাঁধন সরলে দেখেন কক্ষটি সাউন্ডপ্রুফ এবং ছোট। এখানে বন্দিদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। যারা খাবার দিতেন, তাদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ ছিল। কোডনেম জানতে পারার পর খাবার নিয়ে আসা ব্যক্তিকে ভালো মানের খাবার দিতে বলেছিলেন। বড় ভাই এসে সতর্ক করেছিল, এমন কথা বললে পরিণতি ভালো হবে না।
তিনি জানান, শেষবার ইন্টারোগেশন সেলে নেওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করা হয়, ছেড়ে দিলে কী বলবেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা যা বলবেন তাই বলব’। বলা হয়েছিল, “কিছু দুষ্ট লোক আমাকে কিডন্যাপ করেছিল। আমি পালিয়ে এসেছি। অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার আপনাকে সেকেন্ড চান্স দিতে চান।” তিনদিন পর ভোরে তার সেলে ঢুকে চোখ বাঁধা করে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে মাইক্রোবাসে তোলা হয়। গাড়িতে ২০ মিনিট পর একজন জিজ্ঞাসা করেন, ভয় পাচ্ছেন কি? তিনি বলেন না। এরপর গাড়ি থামে, তাকে ফুটপাতে বসিয়ে হ্যান্ডকাফ খুলে দেয়। চোখ খোলার নির্দেশ দিয়ে তিন মিনিট চোখ বন্ধ রাখার পর গাড়ি চলে যায়।
ধারাবাহিকভাবে হেঁটে বাসার দিকে যেয়ে গুলশানে বড় ভাইয়ের বাসায় পৌঁছান। মা সেখানে ছিলেন না। পরে জানতে পারেন আরও দুজনকে গুম করা হয়েছে, একজন ব্যারিস্টার আরমান ও ব্রিগ্রেডিয়ার আজমী।
হুম্মাম জানান, তাকে আটকের সময় সিটিআইবির পরিচালক ছিলেন তৌহিদুল ইসলাম, ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন জেনারেল আকবর। ২০১৭ সালের ২ মার্চ মুক্তি দেওয়ার সময় ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন জেনারেল আবেদিন।
তিনি বলেন, যারা তাকে গুম ও নির্যাতন করেছে, তাদের বিচার চাই। এতে শীর্ষে রয়েছেন শেখ হাসিনা, জেনারেল আকবর, জেনারেল আবেদিন, ব্রিগ্রেডিয়ার তৌহিদুল ইসলাম এবং সহযোগীরা।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তার জেরা হয়নি। জেরার জন্য আসামিপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল আগামী ২৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছে।
এনএন/ ২০ জানুয়ারি ২০২৬





